মাহবুবুর রশিদ:
কানাইঘাটের মসজিদ, মক্তব ও ধর্মীয় শিক্ষার বাস্তবচিত্র তুলে ধরার এক অনন্য প্রয়াসের নাম ‘চারণধ্বনি’। ‘কানাইঘাট উপজেলার মসজিদের ইমাম ও মক্তব শিক্ষার বর্তমান অবস্থা: একটি সমীক্ষা’ শীর্ষক গবেষণা এবং এ-সংক্রান্ত লেখালেখির সংকলন ‘চারণধ্বনি’র প্রকাশনা উৎসব গত ৩১ অক্টোবর ২০২৬ সিলেট নগরীর মিরাবাজারস্থ হোটেল মিরা গার্ডেনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কানাইঘাট গণশিক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই প্রকাশনা উৎসব কেবল একটি বই প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; বরং এটি ছিল কানাইঘাটের ধর্মীয় শিক্ষা, মসজিদ-মক্তব ও সামাজিক উন্নয়নচিন্তার এক বর্ণাঢ্য মিলনমেলা।
সংকলনটি আরও আগে প্রকাশিত হওয়ার কথা থাকলেও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তা কিছুটা বিলম্বিত হয়। কানাইঘাট গণশিক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের সাড়া জাগানো সেমিনার ও গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই অনেকের মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল-কবে প্রকাশিত হবে প্রতীক্ষিত সংকলন ‘চারণধ্বনি’? বিশেষ করে যাঁরা এই সংকলনে তাঁদের মূল্যবান লেখা জমা দিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকের মনেই সংশয় তৈরি হয়েছিল, আদৌ কি প্রকাশনার মুখ দেখবে এটি?
তবে চাইলেই হুট করে ‘চারণধ্বনি’র মতো একটি সমৃদ্ধ সংকলন প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিপুল অর্থায়ন, পর্যাপ্ত সময়, মানসম্মত লেখা সংগ্রহ এবং সেসব লেখার যথাযথ যাচাই-বাছাই ও সম্পাদনা। সব মিলিয়ে এটি ছিল বেশ শ্রমসাধ্য একটি উদ্যোগ।
অক্টোবর মাসের প্রথম দিকে কানাইঘাট গণশিক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক এহসানুল হক জসীম একদিন আমাকে ফোন করে জানালেন, চলতি মাসের মধ্যেই ‘চারণধ্বনি’র কাজ সম্পন্ন করে প্রকাশনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হবে। উল্লেখ্য, ‘চারণধ্বনি’ নামটিও তাঁর দেওয়া এবং পুরো সংকলনটির সম্পাদনার দায়িত্বও তিনি নিজেই পালন করেছেন। তাঁর দৃঢ় প্রত্যয়, আন্তরিকতা ও নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই অবশেষে আলোর মুখ দেখল দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই সংকলন।
অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ফাউন্ডেশনের নেতৃবৃন্দ তাঁদের পরিকল্পনা অনুযায়ী অতিথিদের আমন্ত্রণ জানালেন। অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩১ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা। আমাদের দেশে সাধারণত এ ধরনের অনুষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কিছুটা বিলম্বে শুরু হওয়ার রেওয়াজ থাকলেও ‘চারণধ্বনি’র প্রকাশনা উৎসবে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। ঘড়ির কাঁটা মেনেই যথাসময়ে শুরু হলো অনুষ্ঠান। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পুরো হলরুম কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল।
অনুষ্ঠানে যাঁদের উপস্থিতি ছিল, তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপরিচিত, প্রতিষ্ঠিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। তাঁদের সম্মিলিত উপস্থিতি আয়োজনটিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। অতিথিদের উপস্থিতির ব্যাপকতা ও মর্যাদা দেখে আয়োজকেরাও প্রথমে কিছুটা অভিভূত হয়ে পড়েন। মনে হচ্ছিল, উপস্থিত প্রত্যেকেই যেন প্রধান অতিথি হওয়ার যোগ্যতা রাখেন। যদিও অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কানাইঘাট-জকিগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মাওলানা মোহাম্মদ আবুল হাসান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করার কথা ছিল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এহসানুল হক জসীমের। কিন্তু অতিথি ও সুধীজনদের এমন প্রাণবন্ত উপস্থিতি দেখে তিনি যেন নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলেন না। সভাপতির আসনে বসার পরিবর্তে নিজেই অনুষ্ঠানের সঞ্চালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। তাঁর সাবলীল উপস্থাপনা পুরো আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগীদের পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পুরো হলরুম ছিল দর্শক-শ্রোতায় পরিপূর্ণ। অথচ কোথাও কোনো হৈচৈ কিংবা বিশৃঙ্খলা ছিল না। সবাই যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন কানাইঘাটের মসজিদ ও মক্তবের জরিপ কার্যক্রম, গবেষণার ফলাফল এবং ধর্মীয় শিক্ষার বাস্তব অবস্থা নিয়ে আলোচনা।
অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য করে তুলতে বক্তাদের বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকে পরিবেশিত হয় চমৎকার তশ্না সংগীত। আলোচনা, কোরআন তিলাওয়াত, সংগীত ও অতিথিদের অভিব্যক্তি-সব মিলিয়ে পুরো আয়োজন পেয়েছিল এক ব্যতিক্রমী মাত্রা।
আমার জানামতে, সিলেট নগরীতে কানাইঘাটের কোনো সংগঠনের ব্যানারে এমন বর্ণাঢ্য, সুশৃঙ্খল ও প্রাণবন্ত প্রকাশনা অনুষ্ঠান এর আগে খুব একটা দেখা যায়নি। অনুষ্ঠানে অনেক বক্তাও বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, কানাইঘাটের এ যাবৎকালের সেরা অনুষ্ঠান ছিল ‘চারণধ্বনি’র প্রকাশনা উৎসব।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও কবি কালাম আজাদ তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, “আমি সিলেটে ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২০০টি প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সভাপতি, প্রধান অতিথি কিংবা প্রধান আলোচক হিসেবে অংশ নিয়েছি। এর আগে এত চমৎকার ও জমজমাট কোনো প্রকাশনা অনুষ্ঠান আর দেখিনি। আজকের দিনটি আমার জীবনের অন্যতম একটি স্মরণীয় ও বিশেষ দিন।”
একজন অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ ও অসংখ্য প্রকাশনা অনুষ্ঠানের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তির এমন অভিব্যক্তি নিঃসন্দেহে ‘চারণধ্বনি’র প্রকাশনা উৎসবের সার্থকতারই প্রমাণ বহন করে। অন্যান্য বক্তারাও অনুষ্ঠানটির আয়োজন, গবেষণার গুরুত্ব এবং সংকলনটির ভূয়সী প্রশংসা করেন।
ছয় ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠানটির প্রায় চার ঘণ্টা ধরেই চলে বক্তাদের বক্তব্য। দীর্ঘ সময় ধরে বসে থাকতে থাকতে কারও কারও মধ্যে কিছুটা ক্লান্তি আসাটাই স্বাভাবিক। তবে আয়োজকদের ব্যবস্থাপনায় ছিল চমৎকার আয়োজন। উপস্থিত অতিথিদের জন্য ছিল পর্যাপ্ত আপ্যায়নের ব্যবস্থা। যাঁরা কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন, তাঁরা আপ্যায়ন শেষে আবারও ফিরে আসেন অনুষ্ঠানস্থলে।
একপর্যায়ে উপস্থিত সবার হাতে হাতে পৌঁছে দেওয়া হয় সুদৃশ্য প্যাকেটে মোড়ানো ‘চারণধ্বনি’। সংকলনটির প্রচ্ছদ, মুদ্রণ, গেটআপ ও সামগ্রিক উপস্থাপনা দেখে অতিথিদের মধ্যে আনন্দ ও সন্তুষ্টি লক্ষ করা যায়। আর আনন্দিত হওয়ারই কথা। কারণ, এটি নিছক কোনো সাহিত্য সংকলন নয়; এর ভেতরে সংরক্ষিত রয়েছে কানাইঘাট উপজেলার ৮৫৫টি মসজিদের বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত। একটি উপজেলার এত বিপুলসংখ্যক মসজিদের তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও গবেষণার আওতায় নিয়ে আসা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় কাজ। শুধু সিলেট নয়, বাংলাদেশের আর কোথাও মসজিদ-মক্তব নিয়ে এ ধরনের জরিপ কার্যক্রম হয়েছে কি না, আমার জানা নেই। আমার মনে হয়, এ ক্ষেত্রে কানাইঘাটই প্রথম।
অনুষ্ঠান শেষে অতিথিরা রাতের খাবার গ্রহণ করেন। এরপর হাতে ‘চারণধ্বনি’ নিয়ে যে যাঁর গন্তব্যে ফিরে যান। এভাবেই শেষ হয় একটি স্মরণীয় সন্ধ্যা, একটি ব্যতিক্রমী আয়োজন এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান।
কানাইঘাট গণশিক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের এই প্রকাশনা উৎসব নিঃসন্দেহে কানাইঘাটের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হয়ে থাকবে। কারণ, ‘চারণধ্বনি’ কেবল একটি সংকলনের নাম নয়; এটি কানাইঘাটের মসজিদ-মক্তব, ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়কে তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রয়াস।
এ ধরনের গবেষণা ও প্রকাশনা শুধু বর্তমানকে জানার সুযোগ তৈরি করে না, ভবিষ্যতের জন্যও রেখে যায় মূল্যবান দলিল। তাই ‘চারণধ্বনি’র প্রকাশনা উৎসবের সাফল্যকে কেবল একটি দিনের আনন্দ-উৎসব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি সম্মিলিত উদ্যোগের সার্থক পরিণতি।
সত্যিই, সেদিন শুধু একটি সংকলনের প্রকাশনা হয়নি; সেদিন ধ্বনিত হয়েছিল জ্ঞান, গবেষণা ও সম্ভাবনার এক নতুন বার্তা। সেদিন কানাইঘাটের আকাশে ছড়িয়ে পড়েছিল ‘চারণধ্বনি’র ধ্বনি।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক,কানাইঘাট প্রেসক্লাব।

