Previous
Next

সর্বশেষ


Saturday, June 13

বিদায় জনপদের রূপকার: হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী

বিদায় জনপদের রূপকার: হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী


এহসানুল হক জসীম :

সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, বিশিষ্ট আলেম, শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক প্রিন্সিপাল মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী আর আমাদের মাঝে নেই (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

শনিবার (১৩ জুন) রাত ১টা ৩০ মিনিটে সিলেট নগরীর ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।

তাঁর মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং কানাইঘাট-জকিগঞ্জ তথা সমগ্র সিলেট অঞ্চলের একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান ঘটল। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর পরিচয় একজন রাজনীতিবিদ বা সংসদ সদস্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে শিক্ষা, সমাজসেবা, ধর্মীয় নেতৃত্ব ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিস্তৃত ছিল।

তালবাড়ী থেকে নেতৃত্বের শিখরে

কানাইঘাট উপজেলার তালবাড়ী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী। তাঁর পিতা মাওলানা আবদুল হক চৌধুরী ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। শৈশব থেকেই ধর্মীয় ও নৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল সম্পন্ন করে তিনি এমসি কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বিত ধারা তাঁর ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বকে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতা।

ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখ

ষাট ও সত্তরের দশকে তিনি সিলেট অঞ্চলের ছাত্ররাজনীতির অন্যতম পরিচিত মুখ ছিলেন। ইসলামী ছাত্রসংঘের জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করে তিনি নেতৃত্বের যে দক্ষতা দেখিয়েছিলেন, পরবর্তীতে তা জাতীয় রাজনীতিতেও প্রতিফলিত হয়।জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, সাংগঠনিক সম্পাদক ও অঞ্চল পরিচালকের দায়িত্বসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে তিনি দীর্ঘদিন রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি আদর্শ ও জনকল্যাণের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

সংসদ সদস্য হিসেবে এক স্বর্ণযুগ

২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৫ আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়কে অনেকেই সিলেট-৫ আসনের উন্নয়নের স্বর্ণযুগ হিসেবে উল্লেখ করেন। দীর্ঘদিনের অবহেলিত কানাইঘাট ও জকিগঞ্জে এ সময় যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক পরিবর্তন আসে।

উন্নয়নের স্থপতি

একসময় কানাইঘাট ছিল যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত দিক থেকে পিছিয়ে থাকা একটি জনপদ। কাঁচা রাস্তা, বিদ্যুতের অভাব এবং বিচ্ছিন্ন জনজীবন ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা।

সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি এই চিত্র বদলে দিতে নিরলসভাবে কাজ করেন।

তাঁর সময়েই ঐতিহাসিক বোরহানউদ্দিন সড়ক আধুনিক রূপ পায়। অসংখ্য গ্রামীণ সড়ক পাকাকরণ, ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণের মাধ্যমে বদলে যায় জনপদের যোগাযোগ ব্যবস্থা। সুরইঘাট অঞ্চলের যোগাযোগ উন্নয়ন এবং জকিগঞ্জের বিভিন্ন সড়ক নির্মাণেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

বিদ্যুতায়নেও তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। তাঁর সময়েই কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুতের আলো পৌঁছে যায়, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আনে।

শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া এক মহানায়ক

রাজনীতির বাইরেও তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল একজন শিক্ষানুরাগী হিসেবে।তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা ছাড়া কোনো সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন।

মিরাবাজার শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুল, পাঠানটুলা শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা, আল-আমীন জামেয়া উচ্চ বিদ্যালয়, জালালাবাদ ইন্টারন্যাশনাল আলিম মাদ্রাসা এবং জালালাবাদ কলেজসহ বহু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নিজ গ্রাম তালবাড়ীতেও তিনি ব্যক্তিগত জমি দান করে একটি বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, যা আজও তাঁর দূরদর্শী চিন্তার সাক্ষ্য বহন করছে।

কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা

শিক্ষা ও রাজনীতির পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন সফল উদ্যোক্তাও। সিলেটের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আল-হামরা শপিং সিটির প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তাদের একজন হিসেবে তিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে শত শত মানুষের জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

প্রাজ্ঞ আলেম ও মুফাসসির

মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন উচ্চমানের একজন আলেম ও মুফাসসিরে কুরআন। তাঁর তাফসির ও বয়ানে ছিল জ্ঞানের গভীরতা, প্রজ্ঞা ও সহজ উপস্থাপনা। তিনি কখনো আবেগনির্ভর জনপ্রিয়তার পথ বেছে নেননি; বরং যুক্তি, জ্ঞান ও কুরআনের আলোকে মানুষকে পথ দেখিয়েছেন। তাঁর বয়ান শুনে উপকৃত হয়েছেন হাজারো মানুষ।

সততা ও সৌজন্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক

রাজনীতিতে দীর্ঘ পথচলা সত্ত্বেও তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ ছিল না। ক্ষমতার দম্ভ নয়, বিনয় ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়। দল-মত নির্বিশেষে সকলের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতেন তিনি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও তাঁর সততা, শালীনতা ও ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করতেন।সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দ ব্যবস্থাপনায়ও তিনি ছিলেন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

কিছু স্মৃতি, কিছু অনুভব

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল ও মানবিক। মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থাকা, অসুস্থদের দেখতে যাওয়া কিংবা জানাজায় শরিক হওয়া ছিল তাঁর স্বভাবের অংশ। অনেকের মতো লেখকের জীবনেও তিনি রেখে গেছেন অমলিন স্মৃতি। একজন অভিভাবকের মতো তিনি তরুণদের উৎসাহ দিতেন, খোঁজখবর নিতেন এবং সম্ভাবনাময় মানুষদের এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করতেন।

জনপদের হৃদয়ে চিরজাগরুক

মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যু একটি যুগের অবসান। তবে তাঁর কর্ম, সততা, উন্নয়ন ভাবনা, শিক্ষাবিস্তার এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে মৃত্যুর পরও জীবন্ত রাখবে। কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের অসংখ্য রাস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সেতু, বিদ্যুতের আলো এবং মানুষের স্মৃতিতে তিনি বেঁচে থাকবেন দীর্ঘকাল।

জনপদের এই রূপকার বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আলোকিত পথচিহ্ন আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাবে বহু বছর ধরে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমিন।

কানাইঘাটের শিক্ষাঙ্গনে শোক, জীবনের অঙ্ক শেষ করে চলে গেলেন শিক্ষক আব্দুল মালেক

কানাইঘাটের শিক্ষাঙ্গনে শোক, জীবনের অঙ্ক শেষ করে চলে গেলেন শিক্ষক আব্দুল মালেক


নিজস্ব প্রতিবেদক :

কানাইঘাটের শিক্ষা অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। জুমার দিনে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বীরদল এন এম একাডেমির সহকারী শিক্ষক (গণিত) মুহা. আব্দুল মালেক (৩৫)।

শুক্রবার (১২ জুন) দুপুর প্রায় ১২টার দিকে বীরদল এন এম একাডেমিতে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ানোর সময় তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উদ্ধার করে কানাইঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।

মৃত শিক্ষক আব্দুল মালেকের বাড়ি রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। তবে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতার সুবাদে তিনি পরিবারসহ কানাইঘাটে বসবাস করছিলেন। একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক হিসেবে তিনি শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সহকর্মীদের কাছে ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়।

তার আকস্মিক মৃত্যুতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ পুরো শিক্ষা পরিবারে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে। সহকর্মীরা জানান, প্রতিদিনের মতোই তিনি শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছিলেন। কেউ কল্পনাও করেননি, এদিনই হবে তার জীবনের শেষ কর্মদিবস।

মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক সন্তানসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, শুভানুধ্যায়ী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

শুক্রবার মাগরিবের নামাজের পর বীরদল এন.এম একাডেমি মাঠে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে।


Friday, June 12

কানাইঘাটে বিয়ের অনুষ্ঠানে পরিবারের সদস্যরা, ফাঁকা বাড়িতে চোরের হানা

কানাইঘাটে বিয়ের অনুষ্ঠানে পরিবারের সদস্যরা, ফাঁকা বাড়িতে চোরের হানা


নিজস্ব প্রতিবেদক :
:

কানাইঘাট পৌরসভার বিষ্ণুপুর করচটি গ্রামে সৌদি আরব প্রবাসী আব্দুল কায়ুমের বাড়িতে দিনদুপুরে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (১২ জুন) দুপুর প্রায় ২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। জানা যায়, প্রবাসী আব্দুল কায়ুমের স্ত্রী নাজমা বেগম ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা পাশের একটি কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বাড়ি থেকে বের হন। এ সুযোগে দুর্বৃত্তরা তাদের একতলা পাকা বসতবাড়ির বারান্দার গ্রিল ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে।

চোরেরা ঘরের বিভিন্ন কক্ষ তছনছ করে আলমারি ও শোকেস ভেঙে নগদ প্রায় ৫০ হাজার টাকা এবং প্রায় ৩ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যায়। পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে ফিরে এসে চুরির বিষয়টি জানতে পারেন।

দিনদুপুরে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন চুরির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু উঠতি বয়সী তরুণ ও যুবক মাদকাসক্ত হয়ে বিভিন্ন বাড়িঘরে চুরি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

এ ঘটনায় নাজমা বেগম বাদী হয়ে শুক্রবার বিকেলে কানাইঘাট থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

স্থানীয়রা দ্রুত চোরদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি এলাকায় চুরি-ডাকাতি রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন।




 


কানাইঘাটে পুকুরে ডুবে একসঙ্গে ঝরল দুই নিষ্পাপ প্রাণ

কানাইঘাটে পুকুরে ডুবে একসঙ্গে ঝরল দুই নিষ্পাপ প্রাণ


নিজস্ব প্রতিবেদক : 

সিলেটের কানাইঘাট উপজেলায় পুকুরের পানিতে ডুবে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (১২ জুন) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার সদর ইউনিয়নের নিজ চাউরা পশ্চিম গ্রামে এ হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলো নিজ চাউরা পশ্চিম গ্রামের আলী আহমদের চার বছর বয়সী কন্যা আনিসা বেগম এবং তার ভাগ্নি, পাঁচ বছর বয়সী ফারিয়া বেগম।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, দুপুরে বাড়ির আঙিনায় খেলতে গিয়ে একপর্যায়ে শিশু দুটি নিখোঁজ হয়ে যায়। পরে পরিবারের সদস্যরা তাদের খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর বসতবাড়ির পুকুরে তল্লাশি চালিয়ে শিশু দুটিকে উদ্ধার করা হয়।

তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কানাইঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুজনকেই মৃত ঘোষণা করেন।

পরে শিশু দুটির মরদেহ থানায় নেওয়া হলে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

স্থানীয়রা জানান, ফারিয়া বেগমের বাবার বাড়ি পার্শ্ববর্তী বিয়ানীবাজার উপজেলার দাসেরগ্রামে। তিনি ওই গ্রামের সাদিক আহমদের মেয়ে। ফারিয়া মায়ের সঙ্গে নানার বাড়িতে বেড়াতে এসে এই দুর্ঘটনার শিকার হয়।

একই পরিবারের দুই শিশুর এমন অকালমৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকার পরিবেশ।

Thursday, June 11

জৈন্তাপুরে মাওলানা আব্দুল জব্বারের জানাজায় মানুষের ঢল, আবেগঘন শেষ বিদায়

জৈন্তাপুরে মাওলানা আব্দুল জব্বারের জানাজায় মানুষের ঢল, আবেগঘন শেষ বিদায়


কানাইঘাট নিউজ ডেস্ক:

সিলেটের বিশিষ্ট আলেম, প্রথিতযশা সমাজসেবক ও জমিয়ত নেতা মাওলানা আব্দুল জব্বার (রহ.)-এর জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) দুপুর ৩টায় জৈন্তাপুরের স্থানীয় ক্যাপ্টেন রশিদ মাঠে তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় সংগঠন ও সামাজিক অঙ্গনের নেতৃবৃন্দসহ হাজার হাজার শোকার্ত মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

এর আগে, বুধবার (১০ জুন) দিবাগত রাতে ৬০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি আলেম। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও ৭ সন্তানসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

মাওলানা আব্দুল জব্বার (রহ.) দীর্ঘ তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম লামনীগ্রাম মাদরাসার প্রিন্সিপাল হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। মৃত্যুপূর্ব পর্যন্ত তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সদস্য, জৈন্তাপুর উপজেলা শাখার সভাপতি এবং খতমে নবুওয়াত সংরক্ষণ কমিটি সিলেট জেলা শাখার সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

মরহুমের জানাজায় ইমামতি করেন তাঁর বড় ছেলে হাফিজ মাওলানা আসজাদ আহমদ। জানাজা শেষে তাঁকে লামনীগ্রাম মাদরাসা সংলগ্ন কবরস্থানে দাফন করা হয়।

জানাজার পূর্বে অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত শোক সভায় বক্তারা বলেন, মাওলানা আব্দুল জব্বার ছিলেন একজন নিরহংকার, প্রজ্ঞাবান ও জনদরদি অভিভাবক। সারাজীবন দ্বীনের খেদমত, শিক্ষা বিস্তার এবং সমাজ সংস্কারে তিনি নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। তাঁর সততা, আমানতদারিতা ও বিনয় আগামী প্রজন্মের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে। তাঁর মৃত্যুতে সিলেটের ধর্মীয় ও সামাজিক অঙ্গনে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

সভায় বক্তব্য রাখেন— পূর্ব সিলেট কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের সভাপতি শায়খুল হাদীস আল্লামা আলিম উদ্দিন দুর্লভপুরী, শায়খ মাওলানা হাবিবুর রহমান, জৈন্তাপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব জয়নাল আবেদীন, সাবেক চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ, ইউপি চেয়ারম্যান বাহারুল আলম, ফখরুল ইসলাম, মাওলানা শামসুদ্দিন দূর্লভপুরী, সিলেট মহানগর জমিয়তের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আব্দুল মালিক চৌধুরী, জেলা জমিয়তের সাধারণ সম্পাদক মুফতি এবাদুর রহমান, লন্ডন প্রবাসী শায়খুল হাদীস মাওলানা তরিকুল্লাহ, মাওলানা হিলাল আহমদ হরিপুরী, এডভোকেট মুহাম্মদ আলী, যুব জমিয়তের কেন্দ্রীয় নেতা হাফিজ আব্দুল করিম দিলদার ও মাওলানা শাহিদ হাতিমী প্রমুখ।

মাওলানা আব্দুল জব্বারের ইন্তেকালে গভীর শোক ও পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে লামনীগ্রাম মাদরাসা কর্তৃপক্ষ, কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় জমিয়ত, খতমে নবুওয়াত সংরক্ষণ কমিটি, আবাবিল ফাউন্ডেশন এবং আলো মিডিয়া ফোরামসহ বিভিন্ন সংগঠন। শোকবার্তায় নেতৃবৃন্দ মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসের উচ্চ মাকাম দানের জন্য দোয়া করেন।

কানাইঘাটে কিশোর-কিশোরী ক্লাব ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভা অনুষ্ঠিত

কানাইঘাটে কিশোর-কিশোরী ক্লাব ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভা অনুষ্ঠিত


নিজস্ব প্রতিবেদক:

কানাইঘাট উপজেলায় কিশোর-কিশোরীদের দক্ষতা উন্নয়ন, সচেতনতা বৃদ্ধি ও সামাজিক অবক্ষয় রোধে পরিচালিত কিশোর-কিশোরী ক্লাবগুলোর কার্যক্রম আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে ক্লাব ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

উপজেলা মহিলা বিষয়ক কার্যালয়ের আয়োজনে এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়িত “কিশোর-কিশোরী ক্লাব স্থাপন প্রকল্প”-এর আওতায় বৃহস্পতিবার (১১ জুন) উপজেলা সম্মেলন কক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সামছুন নাহারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাপস চক্রবর্তী তুষার।

সভায় উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, কিশোর-কিশোরী ক্লাবের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন।

সভায় জানানো হয়, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে বর্তমানে কানাইঘাট উপজেলায় ১০টি কিশোর-কিশোরী ক্লাব কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব ক্লাবে প্রতি শুক্র ও শনিবার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিশোর-কিশোরীদের অংশগ্রহণে জীবনদক্ষতামূলক প্রশিক্ষণ, সচেতনতামূলক সেশন এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

ক্লাবগুলোর মাধ্যমে বাল্যবিবাহ, যৌতুক, তালাক, বহুবিবাহ, মাদকাসক্তি, জঙ্গিবাদ, যৌন হয়রানি, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এছাড়া প্রতিটি ক্লাবে একজন সংগীত শিক্ষক ও একজন আবৃত্তি শিক্ষক রয়েছেন, যাদের মাধ্যমে সদস্যদের সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাপস চক্রবর্তী তুষার বলেন, “বর্তমান সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীরা নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। কিশোর-কিশোরী ক্লাবের কার্যক্রম আরও জোরদার করা গেলে তারা সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চা ও খেলাধুলার প্রতি আরও উৎসাহিত হবে।” তিনি ক্লাবগুলোর বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

সভায় ক্লাবগুলোর কার্যক্রম আরও বেগবান করতে বিভিন্ন মতামত তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. জিলানী, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন, থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই বাবুল আহমদ, লক্ষীপ্রসাদ পশ্চিম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন, দিঘীরপাড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মুমিন চৌধুরী, সাতবাঁক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু তাইয়িব শামীম, রাজাগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সামছুল ইসলাম, কানাইঘাট প্রেসক্লাবের সভাপতি নিজাম উদ্দিন, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কার্যালয়ের অফিস সহকারী কবির আহমদসহ কিশোর-কিশোরী ক্লাবের সদস্যরা।

Monday, June 8

মৌলভীবাজারে সৈয়দ তাহেরুন্নেছা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ফ্রি চক্ষু শিবির অনুষ্ঠিত

মৌলভীবাজারে সৈয়দ তাহেরুন্নেছা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ফ্রি চক্ষু শিবির অনুষ্ঠিত


মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:

মৌলভীবাজারে সৈয়দ তাহেরুন্নেছা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে একটি ফ্রি চক্ষু শিবির অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (৮ জুন ২০২৬) সকাল ১১টায় সৈয়দা তাহিরুন্নেছা হাফিজিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে এ চক্ষু শিবিরের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালের সাধারণ সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক ডা. ছাদিক আহমদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইমাদ উদ্দীন।

প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এবং যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাহিদুর রহমান।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক বকশী ইকবাল আহমদ, প্রাউড টু বি সিলেটি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট ইউকের চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট কমিউনিটি লিডার ও তৈয়ব-তাহিরুন্নেছা ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ, যুক্তরাজ্যের বিশিষ্ট কমিউনিটি লিডার মো. মশাহিদুর রহমান, মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সদস্য সচিব সৈয়দ হুমায়েদ আলী শাহীন, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন মাতুক, প্রকৌশলী মো. মনসুরুজ্জামান, সিনিয়র সাংবাদিক এস.এম. উমেদ আলী, যুক্তরাজ্য প্রবাসী কমিউনিটি লিডার নুরুল ইসলাম মাহবুব, প্রবাসী আব্দুল আজিজ, মো. আলাউদ্দিন, জুনেল আহমদ, আব্দাল আহমেদ, আব্দুর রহমান আশিক, যুক্তরাজ্য প্রবাসী সমাজসেবক সায়েম রহমান, মৌলভীবাজার পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও পৌর মেয়র প্রার্থী সৈয়দ মমসাদ আহমদ, শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক তাজ উদ্দিন তাজু, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা সৈয়দ ময়নু, সাংবাদিক মো. শাহজাহান মিয়া এবং মাহবুর রহমান রাহেল প্রমুখ।

চক্ষু শিবিরে এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ বিনামূল্যে চক্ষু পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন। আয়োজকরা জানান, সমাজের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

কানাইঘাট এসোসিয়েশন ইউকের সম্মাননায় ভূষিত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব মনোয়ার আলী

কানাইঘাট এসোসিয়েশন ইউকের সম্মাননায় ভূষিত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব মনোয়ার আলী


লন্ডন প্রতিনিধি:
 

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও কর্পোরেট অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, সিটি ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক পরিচালক, গালফ এয়ার বাংলাদেশের সাবেক জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ), শিক্ষানুরাগী ও শিল্পপতি, কানাইঘাটের কৃতি সন্তান জনাব মনোয়ার আলী-কে সম্মাননা প্রদান করেছে কানাইঘাট এসোসিয়েশন ইউকে।

এ উপলক্ষে গত ৭ জুন পূর্ব লন্ডনের জনপ্রিয় ভেন্যু তারাতারি রেস্টুরেন্টে এক মতবিনিময় সভা ও সম্মাননা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। ইউকে প্রবাসী বিপুল সংখ্যক কানাইঘাটবাসীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কানাইঘাট এসোসিয়েশন ইউকের সভাপতি আনিসুল হক এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আহমদ ইকবাল চৌধুরী। পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন সহকারী সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসাইন মিল্লাত। পরে পরিচিতি পর্ব শেষে ইসলামি নাশিদ পরিবেশন করেন সহকারী সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহমদ চৌধুরী।

মতবিনিময় সভায় বক্তারা মনোয়ার আলীর সুদীর্ঘ কর্মজীবন, নেতৃত্বগুণ এবং সমাজকল্যাণে তাঁর অসামান্য অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তাঁরা বলেন, মনোয়ার আলী শুধু একজন সফল ব্যাংকার ও কর্পোরেট ব্যক্তিত্বই নন, বরং একজন মানবহিতৈষী, সমাজসেবক ও জনদরদী ব্যক্তিত্ব হিসেবেও সর্বমহলে সুপরিচিত।

বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর দীর্ঘদিনের অবদান কানাইঘাটসহ বৃহত্তর সমাজে প্রশংসিত। কানাইঘাটের উন্নয়ন ও জনকল্যাণে তাঁর আন্তরিকতা, দায়বদ্ধতা এবং নিরলস প্রচেষ্টা উপস্থিত সকলের ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে।

প্রতিক্রিয়ায় মনোয়ার আলী তাঁর কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা, সমাজসেবা, কমিউনিটি উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের করণীয় বিষয়ে মূল্যবান বক্তব্য রাখেন। এ সময় উপস্থিত সদস্যবৃন্দও তাঁদের মতামত তুলে ধরেন এবং তাঁর সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করেন।

অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে কানাইঘাট এসোসিয়েশন ইউকের পক্ষ থেকে মনোয়ার আলীর হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে সংগঠনের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান উপদেষ্টাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিরাজুল ইসলাম, মাওলানা রফিক আহমদ, ব্যারিস্টার কুতুব উদ্দীন আহমদ শিকদার এমবিই, ইজ্জত উল্লাহ, একাউন্ট্যান্ট ফারুক আহমদ ও নাজিরুল ইসলাম। এছাড়া সহ-সভাপতিদের মধ্যে খসরুজ্জামান খসরু, সাদিকুল আমিন, আবুল ফাতেহ, মুজিবুর রহমান, মখলিছুর রহমান ও জাহাঙ্গীর আলম নজমুল, ইসি সদস্য শামসুজ্জামান বাহার, কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব ফারুক বুলবুল জামান, কয়ছর আহমদ চৌধুরী, কামাল উদ্দিনসহ সংগঠনের বিপুল সংখ্যক সদস্য, শুভানুধ্যায়ী ও কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

অত্যন্ত আন্তরিক, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও প্রাণবন্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত এ মতবিনিময় সভা কানাইঘাট কমিউনিটির ঐক্য, সম্প্রীতি ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন বক্তারা।

সবশেষে সভাপতি আনিসুল হক উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানান। পরে সংগঠনের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান উপদেষ্টা মাওলানা রফিক আহমদের পরিচালনায় বিশেষ মোনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

কানাইঘাটের তেলক্ষেত্র: ৪৪ বছর পর ফিরে আসা এক সম্ভাবনার ইতিহাস

কানাইঘাটের তেলক্ষেত্র: ৪৪ বছর পর ফিরে আসা এক সম্ভাবনার ইতিহাস


এহসানুল হক জসীম :

বাংলাদেশের জ্বালানি সম্পদের ইতিহাসে সিলেট অঞ্চল বরাবরই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। দেশের বৃহৎ গ্যাসক্ষেত্রগুলোর অধিকাংশই এ অঞ্চলে অবস্থিত। তবে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বড়চাতল এলাকায় অবস্থিত একটি পুরোনো তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান কূপ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় পর্যায়ে নানা আলোচনা, কৌতূহল ও জনশ্রুতি প্রচলিত ছিল। বহু মানুষের বিশ্বাস ছিল, এ অঞ্চলের মাটির নিচে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল ও গ্যাসের মজুত রয়েছে, যদিও সেই সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন কোনো দৃশ্যমান সরকারি আলোচনা ছিল না।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে উত্থাপিত এক প্রশ্নের জবাবে বড়চাতল এলাকার ঐতিহাসিক ‘আটগ্রাম-১’ অনুসন্ধান কূপ সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য সামনে আসায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। এর মাধ্যমে চার দশকেরও বেশি সময় আগে পরিচালিত একটি অনুসন্ধান কার্যক্রমের ইতিহাস, ফলাফল এবং বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সংসদে উত্থাপিত প্রশ্নে নতুন করে আলোচনায় বিষয়টি

জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান কানাইঘাট উপজেলার বড়চাতল এলাকায় অতীতে আবিষ্কৃত তেলক্ষেত্রের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চান।

তার প্রশ্নে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭৮ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে বড়চাতল এলাকায় একটি তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি এবং দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার প্রেক্ষাপটে ওই এলাকা থেকে পুনরায় তেল বা গ্যাস উত্তোলনের কোনো পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে কি না, সেটিও জানতে চাওয়া হয়। সংসদ সদস্যের এ প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় অতীতের অনুসন্ধান কার্যক্রম, পরীক্ষার ফলাফল এবং কূপটির বর্তমান অবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে। ফলে বহু বছর ধরে আলোচনার বাইরে থাকা বড়চাতলের তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের ইতিহাস আবারও জনসমক্ষে আসে।

আটগ্রাম-১: আশির দশকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জার্মান সরকারের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত ‘মাল্টিওয়েল ড্রিলিং প্রজেক্ট (এমডিপি)’-এর আওতায় বড়চাতল এলাকায় ‘আটগ্রাম-১’ নামে একটি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা ১৯৮১ সালের ২৫ জুন কূপটির খনন কাজ শুরু করে। প্রায় এক বছরব্যাপী কার্যক্রম শেষে ১৯৮২ সালের ১০ জুন খনন সম্পন্ন হয়। কূপটির চূড়ান্ত গভীরতা ছিল ১৬ হাজার ২৭৬ ফুট বা প্রায় ৪ হাজার ৯৬১ মিটার।

তৎকালীন সময়ে এটি ছিল দেশের অন্যতম গভীর অনুসন্ধান কূপ। খননকাজ চলাকালে ভূগর্ভস্থ স্তর বিশ্লেষণের মাধ্যমে ছয়টি সম্ভাবনাময় রিজার্ভার স্যান্ড জোন শনাক্ত করা হয় এবং এসব স্তরে পৃথকভাবে পরীক্ষা চালানো হয়।

সরকারি নথি অনুযায়ী, পরীক্ষার সময় বিভিন্ন স্তরে গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। একই সঙ্গে তরল পদার্থও পাওয়া যায়। পরীক্ষাকালীন সময়ে কূপ থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় ০.১৫৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এবং ১ হাজার ২৩৪ ব্যারেল তরল উপাদান বা পানি উৎপাদিত হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কেন বন্ধ হয়ে যায় অনুসন্ধান কার্যক্রম?

প্রাথমিক পরীক্ষায় গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেলেও পরবর্তী সময়ে কূপটির উৎপাদন সক্ষমতা প্রত্যাশিত মাত্রায় স্থায়ী হয়নি।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কিছু সময় পর কূপের ‘ফ্লোয়িং ওয়েলহেড প্রেসার’ বা স্বাভাবিক ভূগর্ভস্থ চাপ দ্রুত কমে যায়। এর ফলে গ্যাস ও তরল পদার্থের প্রবাহও হ্রাস পেতে থাকে। একপর্যায়ে প্রাকৃতিক প্রবাহ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। পেট্রোবাংলার তৎকালীন ‘ওয়েল কমপ্লিশন রিপোর্ট’-এ কূপটিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয় বলে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, তখনকার বাজার পরিস্থিতি, উৎপাদন ব্যয় এবং সম্ভাব্য মজুতের পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে কূপটি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হিসেবে বিবেচিত হয়নি। এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে ১৯৮২ সালের ১০ জুন ‘আটগ্রাম-১’ কূপকে ‘প্লাগড অ্যান্ড অ্যাবান্ডনড’ বা স্থায়ীভাবে বন্ধ ও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

স্থানীয় জনশ্রুতি ও ঐতিহাসিক স্মৃতি

বড়চাতল এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার বিষয়টি স্থানীয় মানুষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বিষয় ছিল। এলাকাবাসীর অনেকেই মনে করতেন, সেখানে তেল ও গ্যাসের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। এলাকার প্রবীণ বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনুসন্ধান কার্যক্রমের সময় এলাকায় বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল। কূপ এলাকায় যাতায়াতের সুবিধার্থে সড়ক উন্নয়ন এবং একটি হেলিপ্যাড নির্মাণের কথাও স্থানীয়রা উল্লেখ করেন।

যদিও এসব স্মৃতি স্থানীয় পর্যায়ে এখনও আলোচিত হয়, তবে কূপটি বন্ধ হওয়ার কারণ সম্পর্কে সরকারি ব্যাখ্যাই বর্তমানে একমাত্র আনুষ্ঠানিক নথিভুক্ত অবস্থান।

বর্তমান জ্বালানি বাস্তবতায় নতুন প্রশ্ন

বাংলাদেশ বর্তমানে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মোকাবিলায় দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন কমে আসা, আমদানি নির্ভরতা বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপের কারণে নতুন জ্বালানি উৎস অনুসন্ধানের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বড়চাতল এলাকার পুরোনো অনুসন্ধান কূপ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, চার দশক আগের প্রযুক্তি ও বর্তমান প্রযুক্তিগত সক্ষমতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।বর্তমানে ত্রিমাত্রিক (৩ডি) সিসমিক জরিপ, উন্নত রিজার্ভার মডেলিং, অনুভূমিক খনন (Horizontal Drilling) এবং আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির মাধ্যমে অতীতে অলাভজনক বিবেচিত কিছু ক্ষেত্রও পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে কোনো ক্ষেত্র পুনরায় উন্নয়নযোগ্য কি না, তা নির্ধারণের জন্য নতুন জরিপ, ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

পুনর্মূল্যায়নের দাবি

কানাইঘাটের বড়চাতল এলাকার বিষয়টি সংসদে আলোচনায় আসার পর স্থানীয় পর্যায়ে নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, আধুনিক প্রযুক্তির আলোকে এ অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন করা যেতে পারে। জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্ভাবনাময় পুরোনো অনুসন্ধান ক্ষেত্রগুলো পর্যায়ক্রমে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স) বা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তায় নতুন জরিপ পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। তবে পুনরায় অনুসন্ধান বা উন্নয়ন কার্যক্রম শুরুর আগে পর্যাপ্ত কারিগরি মূল্যায়ন এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অপরিহার্য বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

পরিশেষ

কানাইঘাটের বড়চাতল এলাকার ‘আটগ্রাম-১’ কূপ বাংলাদেশের জ্বালানি অনুসন্ধানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। চার দশকেরও বেশি সময় আগে পরিচালিত অনুসন্ধান কার্যক্রমে গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেলেও অর্থনৈতিক কারণে কূপটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বিষয়টি পুনরায় আলোচনায় আসায় পুরোনো এই অনুসন্ধান ক্ষেত্র নতুন করে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং জ্বালানি বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের সম্ভাবনা পুনর্মূল্যায়নের প্রশ্নও সামনে এসেছে।

বড়চাতলের ভূগর্ভে কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও গবেষণা, জরিপ ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, কানাইঘাটের এই অনুসন্ধান কূপ বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে এখনও প্রাসঙ্গিকতা ধরে রেখেছে।



Sunday, June 7

হাসপাতালের শয্যায় জনপদের উন্নয়নপুরুষ, স্মরণে তাঁর অবদান

হাসপাতালের শয্যায় জনপদের উন্নয়নপুরুষ, স্মরণে তাঁর অবদান

 

রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের এক মুরব্বীর সাথে এমপি থাকাকালীন সময়ে কুশল বিনিময় করছেন মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী

এহসানুল হক জসীম::

সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য প্রিন্সিপাল মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর জীবন, কর্ম ও অবদান এই অঞ্চল তথা সমগ্র সিলেটের মানুষের কাছে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি একাধারে একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ, দূরদর্শী শিক্ষাবিদ ও শিক্ষানুরাগী, অনন্য সমাজসংস্কারক ও উচ্চমাপের আলেমে দ্বীন। দীর্ঘকাল ধরে সিলেটের ইসলামী রাজনীতি ও জনকল্যাণমুখী কর্মকাণ্ডে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের অবহেলিত জনপদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সামগ্রিক উন্নয়নে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। সিলেটে মানসম্মত ও আধুনিক শিক্ষার প্রসারে তাঁর হাত ধরে যে বিপ্লব সাধিত হয়েছে, তা এককথায় অনস্বীকার্য। সেই মানুষটি আজ অনেক দিন থেকে হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছেন। 

জন্ম ও প্রাথমিক জীবন::

মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী কানাইঘাটের এক কীর্তিমান সন্তান। সম্প্রতি ইবনে সিনা হাসপাতালে তাঁকে দেখতে গিয়ে তাঁর সুযোগ্য সন্তান নাজমুস সাকিব চৌধুরীর সাথে আলাপকালে তাঁর ব্যক্তিজীবনের কিছু প্রসঙ্গ উঠে আসে। সাকিব জানায়, তাঁর বাবার বর্তমান বয়স ৮২ বছর। সেই হিসেবে সাবেক এই এমপির জন্ম ১৯৪৪ সালে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক কিছু রেকর্ড অনুযায়ী তাঁর জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর। ১৯৪৪ বা ১৯৪৭—কালের যে প্রহরেই হোক না কেন, সিলেট জেলার কানাইঘাট উপজেলার তালবাড়ী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাওলানা আবদুল হক চৌধুরী ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর মাতাও ছিলেন এক মহীয়সী নারী—যিনি ৭ নং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের ঘড়াইগ্রামের প্রখ্যাত আলেম সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার সাবেক ভাইস প্রিন্সিপাল মরহুম মাওলানা জিল্লুর রহমানের আপন বোন। শৈশব থেকেই প্রখর মেধার অধিকারী ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী এক গভীর ধর্মীয় ও নৈতিক আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন। তাঁর শিক্ষাজীবন গড়ে উঠেছিল ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার এক অপূর্ব সমন্বয়ে।

তিনি ঐতিহ্যবাহী সিলেট সরকারী আলিয়া মাদ্রাসার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও খ্যাতিমান কৃতি ছাত্র। এই প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি ১৯৫৯ সালে দাখিল, ১৯৬৩ সালে আলিম, ১৯৬৫ সালে ফাজিল এবং ১৯৬৭ সালে কৃতিত্বের সাথে কামিল পাস করেন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে তিনি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন এবং একই কলেজে বাংলা অনার্সেও অধ্যয়ন করেন। শিক্ষাজীবনের এক পর্যায়ে তিনি গাছবাড়ী জামিউল উলূম কামিল মাদ্রাসায় আলিম শ্রেণিতে এক বছর পড়াশোনা করেছিলেন, পরে অবশ্য পুনরায় সিলেট আলিয়া মাদ্রাসায় ফিরে যান। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষে নিজেকে সমাজসেবা ও দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে বিলিয়ে দেন। মূলত ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর ভেতর নেতৃত্ব ও সমাজভাবনার স্ফুরণ ঘটেছিল।

ষাট ও সত্তরের দশকে ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন সিলেট অঞ্চলের ছাত্ররাজনীতির অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তিনি তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসংঘের সিলেট জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। আশির দশকে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন এবং নিজের সততা, কর্মদক্ষতা ও বাগ্মিতার জোরে সাধারণ মানুষের চোখের মণি হয়ে ওঠেন। কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন; বিভিন্ন মেয়াদে দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং অঞ্চল পরিচালকের মতো গুরুদায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সাথে পালন করেন। অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নিজ সংগঠনের আদর্শ ও গণমানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সক্রিয় ছিলেন।

সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক নিয়ে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সম্মানজনক ভোট পান। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ব্যালটের লড়াইয়ে তিনি ভোটে বিজয়ী হন এবং রেডিও-টেলিভিশনের প্রাথমিক ফলাফলে তাঁর বিজয় ঘোষিতও হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, তৎকালীন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রতিপক্ষের নানামুখী কৌশলের কারণে একটি কেন্দ্রের স্থগিত ভোট পুনর্নির্বাচনের নামে তাঁর নিশ্চিত বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

অবশেষে, ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে তিনি সিলেট-৫ আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ থেকে ২০০৬—এই পাঁচ বছর ছিল সিলেট-৫ আসনের ইতিহাসের এক অবিসংবাদিত ‘স্বর্ণযুগ’। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হারিছ চৌধুরী এবং সংসদ সদস্য মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী—এই দুই ব্যক্তিত্ব নিজ নিজ অবস্থান থেকে সমন্বিতভাবে কাজ করায় দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-বঞ্চিত এই জনপদে এক অভূতপূর্ব উন্নয়ন জোয়ার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

এলাকার উন্নয়নে বৈপ্লবিক রূপান্তর:

২০০১ সালের পূর্বে সিলেট-৫ আসনের যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। বিশেষ করে কানাইঘাট উপজেলা ছিল প্রায় বিচ্ছিন্ন ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। সিলেট শহর থেকে কানাইঘাট যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ঐতিহাসিক ‘বোরহানউদ্দিন রাস্তা’ তখনো ছিল কাঁচা ও চলাচলের অযোগ্য। উপজেলার সিংহভাগ মানুষই বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। সে সময় একটি স্লোগান ছিল—“আর কোনো দাবি নাই, বিদ্যুৎসহ রাস্তা (বোরহানউদ্দিন) চাই।”

সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী এই অবহেলিত জনপদের চেহারা বদলে দিতে কোমর বেঁধে নামেন। যোগাযোগ ব্যবস্থায় তিনি যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন, তা এই অঞ্চলের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এই রকম করে আর কে কাজ করতে পারবেন এলাকার জন্য-- সেটা সময় বলে দেবে। তবে বিগত প্রায় চার মাস ধরে বর্তমান সংসদ সদস্য মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান যেভাবে জনকল্যাণে তৎপর রয়েছেন, তা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক; আশা করি তিনি তাঁর পুরো মেয়াদে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন। যাহোক, ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর উন্নয়ন ছিল এক দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিপ্রস্তর। তাঁর উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে:

যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে তিনি অনন্য ভূমিকা রাখেন। গ্রামীণ কাঁচা রাস্তাঘাট পাকাকরণ, কালভার্ট ও ব্রিজ নির্মাণের মাধ্যমে তিনি যাতায়াত ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটান। কানাইঘাটবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ‘বোরহানউদ্দিন রাস্তা’কে তিনিই প্রথম পিচঢালা পথে রূপান্তর করে গাড়ি চলাচলের উপযোগী করেন। সুরমা নদীর দুই পাড়ের মানুষের মেলবন্ধনের জন্য কানাইঘাট সুরমা সেতুর নির্মাণকাজ তাঁর সময়েই শুরু হয়। অবশ্য এই সেতু বাস্তবায়নে হারিছ চৌধুরীর অনস্বীকার্য অবদান রয়েছে। সোজাকথায়, হারিছ চৌধুরীর কারণে এই ব্রীজ হয়েছে। 

সুরইঘাট অঞ্চলের সংযোগ স্থাপনে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখেন সাবেক এই এমপি। কানাইঘাটের সাথে অত্যন্ত দুর্গম ও প্রতিকূল সুরইঘাট অঞ্চলের বর্তমান চমৎকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীরই দূরদর্শী পরিকল্পনার ফসল। এই রাস্তাটি নির্মাণের ক্ষেত্রে তিনি রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠেছিলেন। ওই অঞ্চলে তাঁর ভোটের হিসাব কেমন ছিল—তা কখনো তাঁর উন্নয়ন ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করেনি।

জকিগঞ্জের উন্নয়নেও বৈষম্যহীনভাবে ভূমিকা রাখেন। জকিগঞ্জের শেওলা রাস্তা পাকাকরণসহ কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের প্রতিটি প্রান্তে তাঁর ছোঁয়া আজও স্পষ্ট। স্থানীয়রা অকপটে স্বীকার করেন—তিনি মাত্র ৫ বছরে যে কাজ করেছেন, তা সাধারণ সময়ে ৩০ বছরেও সম্ভব হতো না। তাঁর বিদায়ের পর এবং বর্তমান এমপির দায়িত্ব নেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মাঝখানের দীর্ঘ ২০ বছর উন্নয়ন গতি থমকে থাকায় এলাকাটি যে পিছিয়ে পড়েছিল, তা আজ পূরণ করা বড় চ্যালেঞ্জ।

বিদ্যুতায়নে তাঁর ভূমিকা স্মরণীয়। গ্রামীণ জনপদে বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সময়েই কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছায়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল করে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

তিনি ক্ষমতার দাপট দেখাননি, বরং একজন বিনয়ী সেবকের মতো মানুষের দ্বারে দ্বারে ছুটে গেছেন। দুর্নীতিমুক্ত ও নিষ্কলঙ্ক রাজনৈতিক জীবনের তিনি এক উজ্জ্বল বাতিঘর।

শিক্ষাক্ষেত্রে অনবদ্য অবদান:

রাজনীতি ও সংসদীয় জীবনের বাইরে মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর জীবনের সবচেয়ে স্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী অবদান রয়েছে শিক্ষাক্ষেত্রে। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন, শিক্ষার আলো ছাড়া কোনো অনগ্রসর সমাজকে বদলে দেওয়া সম্ভব নয়। এই বিশ্বাস থেকে তিনি সিলেট শহর ও নিজ নির্বাচনী এলাকায় অসংখ্য মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

কর্মজীবনের শুরুতে তিনি সিলেট নগরীর ঐতিহ্যবাহী মিরাবাজার শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুলের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রতিষ্ঠানটির মজবুত ভিত্তি দাঁড় করান। এছাড়া সিলেট নগরীর পাঠানটুলা শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা (যেখানে তিনি দীর্ঘদিন রেক্টর ছিলেন), মেজরটিলার আল-আমীন জামেয়া উচ্চ বিদ্যালয়, জালালাবাদ ইন্টারন্যাশনাল আলিম মাদ্রাসা এবং সোবহানীঘাটস্থ জালালাবাদ কলেজ প্রতিষ্ঠা ও সুচারু পরিচালনায় তিনি প্রধান উদ্যোক্তার ভূমিকা পালন করেন।

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জমি দান করে তিনি নিজ গ্রাম তালবাড়ীতে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে একটি বিশাল ও দৃষ্টিনন্দন মাদ্রাসা ক্যাম্পাস স্থাপন করেন। সুরমা নদীর ভাঙন থেকে রক্ষা করতে পরবর্তীতে মাদ্রাসাটি বোরহানউদ্দিন রাস্তার পাশে স্থানান্তর করা হয়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান অত্যন্ত চমৎকার, কারণ তিনি সর্বদা মানসম্মত ও আধুনিক দ্বীনি শিক্ষার ওপর জোর দিতেন। এ ছাড়াও সিলেটে ‘আনজুমানে খেদমতে কুরআন’ এবং ‘দি সিলেট ইসলামিক সোসাইটি’র মতো সমাজ ও দ্বীনি খেদমতধর্মী সংগঠন প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন অন্যতম অগ্রদূত।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ব্যবসায়িক উদ্যোগ:

মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী কেবল কিতাবি আলেম বা রাজনীতিক নন, তিনি ছিলেন একজন সফল উদ্যোক্তাও। সিলেটের আধুনিক ও অন্যতম বৃহৎ শপিং কমপ্লেক্স ‘আল-হামরা শপিং সিটি’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। এমন বহু বাণিজ্যিক স্থাপনা ও উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি শত শত যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রেখেছেন। অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন।  

প্রাজ্ঞ মুফাসসির ও বক্তা হিসেবে:

ইলমি ও আধ্যাত্মিক পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি অত্যন্ত উচ্চমানের একজন আলেম ও মুফাসসিরে কুরআন। সমাজ ও রাজনীতির শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি যখনই কুরআনের তাফসির বা ওয়াজ মাহফিলে দাঁড়াতেন, মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত। তাঁর বয়ানে সস্তা কোনো সুর বা কৃত্রিমতা ছিল না, কিন্তু ছিল জ্ঞানের গভীরতা, প্রজ্ঞা ও ইলমের অনন্য ছোঁয়া। অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায় তিনি গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা করতেন। যারা একবার তাঁর বয়ান শুনেছেন, তারা অনুধাবন করতে পেরেছেন যে তিনি কত বড় মাপের তত্ত্বজ্ঞানী আলেম ছিলেন। তাঁর বয়ান শুনে পথের দিশা পেয়েছে, উপকৃত হয়েছে বহু মানুষ। 

ব্যক্তিত্ব ও অবদানের মূল্যায়ন:

মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী একজন অমায়িক, সদালাপী এবং ঋষিতুল্য দূরদর্শী নেতা। দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সজ্জন ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক পরমতসহিষ্ণুতা এবং উদারতার কারণে বিরোধী শিবিরের মানুষও তাঁকে অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা জানাতেন। ক্ষমতার লোভ-লালসা ও সংকীর্ণ রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে তিনি নিজেকে একজন খাঁটি ভদ্রলোক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ফলশ্রুতিতে তাঁর শয্যাপাশে যেমন ছুটে গিয়েছেন বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান, তেমনি বাণিজ্য মন্ত্রী আব্দুল মুক্তাদিরও তাঁকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছেন। আবার হুছামুদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী তাঁকে দেখতে যান। এর আগে হাফিজ আহমদ মজুমদারও তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন। 

মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী যেমন সৎ, তেমনই পরহেজগার। শত ব্যস্ততার মাঝেও নামাজের ওয়াক্ত হওয়ার সাথে সাথে তিনি জায়নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। অনেকবার তাঁর সাথে একই গাড়িতে সফরের সৌভাগ্য হয়েছে, দেখেছি নামাজের প্রতি তাঁর গভীর মনোযোগ। তিনি একজন আপাদমস্তক সত্যবাদী মানুষ; সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য কখনো কাউকে মিথ্যা আশ্বাস দেননি। সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দে যেখানে দুর্নীতির ছোঁয়া থাকে, সেখানে তিনি ছিলেন শতভাগ স্বচ্ছ ও কলঙ্কমুক্ত। 

স্মৃতি সাগরের ঢেউ,কিছু ব্যক্তিগত অনুভূতি:

ব্যক্তিগতভাবে এই মানুষটির সাথে কাটানো কিছু স্মৃতি আজ মনের জানালায় বারবার উঁকি দিচ্ছে। তাঁর কাছাকাছি গেলে কখনো মনে হতো না যে তিনি একজন সংসদ সদস্য বা সাবেক সংসদ সদস্য; বরং একজন অত্যন্ত স্নেহশীল, বিনয়ী ও প্রাজ্ঞ মুরুব্বির অভিভাবকত্ব অনুভব করতাম। মানুষের সুখ-দুঃখে, বিশেষ করে অসুস্থ মানুষের শয্যাপাশে এবং জানাজায় শরিক হওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো ক্লান্তি ছিল না।

স্মৃতিপটে ভেসে উঠছে সেই দিনটির কথা, যেদিন আমার শ্রদ্ধেয় পিতার জানাজা ছিল। পূর্বনির্ধারিত গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও তিনি সব ফেলে আমার বাবার জানাজায় শরিক হয়েছিলেন। সেদিন আমি ছিলাম ইমাম, আর এত বড় একজন নেতা ও সাবেক এই এমপি ছিলেন আমার পেছনের মুসল্লি! শুধু তা-ই নয়, সেদিন বিকেলে তিনি নিজে ফোন করে আমাদের খোঁজ নিয়েছিলেন, সান্ত্বনা ও গভীর শোক প্রকাশ করেছিলেন।

আরেকটি দিনের কথা মনে পড়ে; আমাদের অঞ্চলের একটি গ্রামে এমপি হিসেবে তাঁর রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি শেষ করে তিনি মাগরিবের নামাজ আদায় করলেন। আমি বিনীতভাবে আরজ করলাম, “আমন্ত্রিত মেহমান হিসেবে চলুন আমাদের বাড়িতে একটু চা খেয়ে যান।” তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে অত্যন্ত নিরহংকার চিত্তে আমাদের সাধারণ ড্রয়িংরুমে এসে বসলেন এবং আপ্যায়ন গ্রহণ করলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন প্রথম বর্ষে ভর্তি হই, তখন তাঁর এমপি মেয়াদের শেষ দিক। একদিন হঠাৎ ফোন করে বললেন, “আমার ফ্ল্যাটে চলে এসো, তোমাকে আজ সংসদ ভবনে নিয়ে যাব, অধিবেশন দেখবে।” একজন তরুণের জন্য সেটি কী যে আনন্দের ও গৌরবের ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তাঁর দেওয়া পাস নিয়েই আমার জীবনের প্রথম সংসদ ভবনে প্রবেশ। সাংবাদিকতা পেশায় এসে পেশাগত কারণে সংসদে যেতে হয় এবং আজকের বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনেও সংসদে যাওয়া হবে, কিন্তু তাঁর হাত ধরে সেই প্রথম সংসদ দেখাটাই আমাকে পরবর্তী জীবনে ‘সংসদ বিট’ বা পার্লামেন্টারি জার্নালিজমে কাজ করার গভীর অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।

জীবন সায়াহ্নে:

গত কিছুদিন ধরে তাঁর গুরুতর অসুস্থতার খবর আমাদের সবাইকে গভীরভাবে মর্মাহত করে। দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ তাঁর জন্য দোয়া করছেন। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি যেন তাঁর মহান রবের ডাকে এখনই সাড়া না দেন। আমরা চাই, তিনি আরো কিছুদিন বাঁচুন। আমরা চাই, জনপদের প্রিয় মানুষটি ফিরে আসুক আবার তাঁর প্রিয় জনপদে। আল্লাহ চাইলে কী না পারেন। এই অন্তিম অবস্থা থেকেও আল্লাহ তাঁকে সুস্থ করে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দিতে পারেন। জানিনা কী হবে। তবুও বলতে হয় ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী আজ জীবন সায়াহ্নে। 

ঈদের আগের দিন, ২৭ মে তারিখে, তাঁকে দেখতে যাই সিলেট নগরীর ইবনে সিনা হাসপাতালে। আছেন আইসিইউর বেডে। অক্সিজেন সাপোর্টও তাঁকে দেওয়া হচ্ছে। এর আগের কয়েক দিন থেকে ওই দিন তিনি তুলনামূলকভাবে ভালো ছিলেন। তাকালেন আমাদের দিকে, চিনতে পারলেন। কিছু বলতে চাইলেন, পারলেন না। হাত নাড়াতে চাইলেন, কিন্তু সেই শক্তি যে এখন আর তাঁর নেই। অপলক দৃষ্টিতে সাবেক এই এমপির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। আহা! কী মানুষ আজ কেমন অবস্থায় হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছেন।  

তিনি এখন পর্যন্ত ৮২ বছরের বর্ণাঢ্য, পুণ্যময় ও কর্মমুখর জীবনের অধিকারী এক মানুষ। তিনি আজ আমাদের মাঝে থেকেও চলাফেরায় নেই। কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের অবহেলিত জনপদকে আধুনিকতায় রূপ দেওয়ার পেছনে তাঁর যে অক্লান্ত শ্রম, সততা ও ভালোবাসা—তা তাঁকে এই অঞ্চলের মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে। কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের ইতিহাসের পাতায় প্রিন্সিপাল মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর নাম একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা থাকবে।




Saturday, June 6

শায়খে লক্ষিপুরীর সুস্থতা কামনায় কানাইঘাট মাদ্রাসায় বিশেষ দোয়া মাহফিল

শায়খে লক্ষিপুরীর সুস্থতা কামনায় কানাইঘাট মাদ্রাসায় বিশেষ দোয়া মাহফিল


নিজস্ব প্রদিবেদক : 

জামেয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম দারুল হাদীস কানাইঘাটের মুহতামিম ও শায়খুল হাদীস, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ হযরত মাওলানা মুহাম্মদ বিন ইদ্রিস (শায়খে লক্ষিপুরী) এর দ্রুত সুস্থতা কামনায় খতমে ইউনুস ও বিশেষ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।

শনিবার দুপুর থেকে যোহরের নামাজ পর্যন্ত মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অংশগ্রহণ করেন। এ সময় শায়খে লক্ষিপুরীর পূর্ণ সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করে ব্যাপকভাবে খতমে ইউনুস পাঠ করা হয়।

যোহরের নামাজের পর জামেয়ার নায়েবে মুহতামিম ও শায়খুল হাদীস আল্লামা আলিমুদ্দীন শায়খে দুর্লভপুরী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে আবেগঘন পরিবেশে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন। মোনাজাতে শায়খে লক্ষিপুরীর আশু রোগমুক্তি, সুস্বাস্থ্য ও খেদমতময় দীর্ঘ জীবন কামনা করা হয়।

দোয়া মাহফিল শেষে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ দেশ-বিদেশে অবস্থানরত শাগরিদ, মুহিব্বীন, মুতাআল্লিকীন এবং ভক্ত-অনুরাগীদের প্রতি শায়খে লক্ষিপুরীর সুস্থতার জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করার আহ্বান জানান।

উল্লেখ্য, শায়খে লক্ষিপুরী দীর্ঘদিন ধরে দ্বীনি শিক্ষা, দাওয়াত ও হাদীসের খেদমতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছেন। তাঁর অসুস্থতার খবরে দেশ-বিদেশের অসংখ্য ছাত্র, শুভাকাঙ্ক্ষী ও ভক্ত-অনুরাগীদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

সর্বসাধারণের কাছে সমাদৃত এক বুজুর্গ আলেম

সর্বসাধারণের কাছে সমাদৃত এক বুজুর্গ আলেম


ইলিয়াস মশহুদ:

যুগে যুগে আল্লাহতায়ালা এমন কিছু মহান ব্যক্তিকে পৃথিবীতে পাঠান, যারা আল্লাহর দ্বীনের অনুসারীদের শিরক, বিদআত ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত করে সরল-সঠিক ও নির্ভেজাল পথের নির্দেশনা প্রদান করেন। এ সব মনীষীর মধ্যে আলেমকুল শিরোমনি, দেশ ও ইসলামের তরে নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্ব, আধ্যাত্মিক জগতের ধ্রুবতারা মাওলানা মুহাম্মদ বিন ইদ্রিস লক্ষীপুরী অন্যতম একজন। তিনি শায়খে লক্ষীপুরী নামে খ্যাত।

মাওলানা মুহাম্মদ বিন ইদ্রিস লক্ষীপুরী নববি চরিত্রের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। পূর্ববর্তী আলেম-উলামাদের পদাঙ্ক অনুসারী। সাহাবি আদর্শের উজ্জ্বল নমুনা। সরল-সঠিক পথের গগনচুম্বী মিনারা। দৃঢ় সংকল্প আর হিম্মতের ওপর পর্বতসম অটল। ভ্রষ্টতার আঁধারে আচ্ছন্ন সমাজে প্রদীপ্ত মশাল। তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির মূর্ত প্রতীক। তিনি আলেম সমাজের উজ্জ্বল এক নক্ষত্র। বৃহত্তর সিলেটের সর্বসাধারণের কাছে সমাদৃত আস্থাভাজন এক প্রবাদতুল্য বুজুর্গ। তিনি একাধারে একজন মাদ্রাসা পরিচালক, শায়খুল হাদিস ও বহুমাত্রিক দ্বীনি খেদমত আঞ্জাম দানকারী এবং আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.)-এর সার্থক উত্তরসূরি।

শায়খুল ইসলাম সাইয়্যিদ হোসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর চারণভূমি, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের বসতভূমি সিলেট জেলার কানাইঘাট উপজেলার লক্ষীপুর গ্রামে ১৯২৪ সালে তিনি জন্মগহণ করেন। পিতা মাওলানা ইদ্রিস আহমদ (রহ.) ও মা নুরুন্নেসা খানম। জন্মের পর বাবা-মা আদর করে তার নাম রাখেন মুহাম্মদ।

পিতা মাওলানা ইদ্রিস (রহ.) একজন ধীমান আলেম ছিলেন। ঐতিহ্যবাহী কানাইঘাট মাদ্রাসার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। বিচক্ষণ এই আলেম ১৯২২ সালের কানাইঘাটে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি এই মাদ্রাসার মুহতামিম ছিলেন এবং যুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.) সহ বহু জ্ঞানী-গুণীর শিক্ষক ছিলেন তিনি।

তার বয়স যখন মাত্র তিন বছর, তখন পিতা মাওলানা ইদ্রিস (রহ.) ইন্তেকাল করেন। পিতৃহারা সন্তান মায়ের স্নেহ মমতায় লালিত-পালিত হন ও তারই তত্বাবধানে প্রাথমিক লেখাপড়ার হাতেখড়ি। এরপর গ্রামের সাবাহি মক্তব (সকালের মক্তব) আরবি শিক্ষাগ্রহণ করে বায়মপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে লেখাপড়া করেন। এরপর মাওলানা মুফতি ফয়জুল হক (রহ.) তাকে লালারচক রহমানিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দেন। শিশুকালে পিতৃহারা হওয়ার কারণে একটু দেরিতে তিনি মাদ্রাসায় যান। এখানে তিনি শরহে জামী (আলিয়া সুওম) পর্যন্ত অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে লেখাপড়া করেন। ১৯৫৩ সালে আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.) কানাইঘাট মাদ্রাসায় চলে এলে ১৯৫৭ সালে তিনিও চলে আসেন কানাইঘাট দারুল উলুম মাদ্রাসায়। ভর্তি হন মুখতাসারুল মাআনি জামাতে। মুখতাসার থেকে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত অত্যন্ত সুনাম ও সুখ্যাতির সঙ্গে লেখাপড়া করে ১৯৬২ সালে তাকমিল ফিল হাদিস পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ অধিকার করে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। তাছাড়া প্রতিটি পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে ঈর্ষণীয় ফলাফল অর্জন করেন।

সাধারণত যারা ছাত্রজীবনে লেখাপড়ায় মেধাবী ও ভালো হন, সুন্নতের ওপর যত্নশীল ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী হন, সেসব ছাত্রকে শিক্ষকরা নিজেদের প্রতিষ্ঠানের উস্তাদ হিসেবে নিয়োগ দিতে খুবই আগ্রহী হন। মাওলানা লক্ষীপুরীর বেলায় তাই হয়েছে। তিনি দাওরায়ে হাদিস সমাপনের পর আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.) তাকে কানাইঘাট দারুল উলুমে শিক্ষক হিসেবে দেন। কানাইঘাট মাদ্রাসাই তার ছাত্রজীবনের শেষ অধ্যায় এবং এখানেই কর্মজীবনের সূচনা। যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস স্বীয় উস্তাদদের সঙ্গে অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে পাঁচ বছর শিক্ষকতা করেন এখানে। এরপর আল্লামা বায়মপুরী (রহ.) তাকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মুশাহিদিয়া খাগাইল মাদ্রাসায় সদরুল মুদাররিস হিসেবে পাঠিয়ে দেন। এখানে তিনি অত্যন্ত সুনাম ও সুখ্যাতির সঙ্গে তিন বছর শিক্ষকতা করেন। ১৯৭০ সালে আল্লামা বায়মপুরী (রহ.) ইন্তেকাল করলে আল্লামা মুজাম্মিল (রহ.)-এর নির্দেশে আবারও তিনি কানাইঘাট মাদ্রাসায় চলে আসেন। ১৯৭০ সাল থেকে সুদীর্ঘ অর্ধশতাব্দী তিনি দরসে নেজামীর গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল কিতাবাদিসহ হাদিসের বিশুদ্ধ কিতাব সহিহ বোখারি দীর্ঘ চারদশক ধরে অত্যন্ত সুনাম ও সুখ্যাতির সঙ্গে পাঠদান করে আসছেন। তার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের সোনালি ফসল হিসেবে বহু কৃতী শাগরিদ দেশে-বিদেশে বিভিন্ন স্থানে দ্বীনের বহুমুখী খেদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন।

আল্লামা বায়মপুরী (রহ.) লক্ষীপুরী হুজুরকে জ্ঞান-বুদ্ধি, ইলম, আমল ও সুন্দর ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত স্নেহ করতেন। এমনকি দূর সম্পর্কে ভাগনে হওয়া সত্বেও নিজের মেয়েকে তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে নতুনভাবে আবারও আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করেন। ১৩৭০ বাংলা সনে আল্লামা বায়মপুরী (রহ.)-এর বড় মেয়ে রায়হানা বেগমের সঙ্গে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার ঘরে কোনো সন্তানাদি না হওয়ায় চড়িপাড়ায় দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দ্বিতীয় সংসারে এক কন্যাসন্তান জন্মের পরই মৃত্যুবরণ করেন। পারিবারিক জীবনে তার আর কোনো সন্তান না থাকলেও হাজার হাজার রুহানি সন্তান আছে দেশে-বিদেশে।

তিনি মাদ্রাসায় শিক্ষাদানের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে যাচ্ছেন। তিনি দীর্ঘদিন কানাইঘাট মাদ্রাসার নায়েবে মুহতামিমের দায়িত্ব পালনের পর ২০০৭ সালে তার ওপর মুহতামিমের গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তিনি সব মত-পথের ঊর্ধ্বে উঠে মাদ্রাসার উস্তাদ ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় অত্যন্ত সুন্দরভাবে এই দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। কানাইঘাট মাদ্রাসা ছাড়াও লালারচক রহমানিয়া মাদ্রাসার মুহতামিমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া সিলেটের আলেম-উলামাদের ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম আজাদ দ্বীনি এদারায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি মুশাহিদিয়া কেরাত প্রশিক্ষণ শিক্ষা বোর্ডের প্রধান পৃষ্ঠপোষক।

তাজকিয়ায়ে নফস তথা আত্মশুদ্ধির জন্য তিনি আপন উস্তাদ ও শ্বশুর শায়খুল ইসলাম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.)-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করে ইজাজত লাভ করেন। আধ্যাত্মিকতার জগতে আল্লামা বায়মপুরী (রহ.) ছিলেন খুব উচ্চমাপের সাধক। তিনি হাতেগোনা কয়েকজনকে খেলাফত প্রদান করেন, এর মধ্যে মাওলানা লক্ষীপুরী অন্যতম। বর্তমানে তিনিই তার একমাত্র জীবিত খলিফা।

তিনি সুদীর্ঘ অর্ধশতাব্দী ধরে মাদ্রাসায় পাঠদান ও পরিচালনার পাশাপাশি সাধারণ জনগণকে দ্বীনি শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশে ওয়াজ-নসিহত ও দাওয়াতের খেদমত করে যাচ্ছেন। তিনি কোরআন-হাদিসের আলোকে ইখলাস ও দরদের সঙ্গে বয়ান করেন। বৃহত্তর সিলেটের প্রায় মসজিদ-মাদ্রাসার বার্ষিক মাহফিলে বয়ান পেশ করেন। তার বয়ানে উপকৃত হন সর্বসাধারণ। তিনি নব্বইয়ের দশক থেকে কানাইঘাট বাজার মসজিদে খতিবের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার বয়ানে বসলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়, সুন্নতের অনুসরণের প্রতি মনে আগ্রহ জন্মে, আমল ও ইবাদত-বন্দেগির প্রতি মনে ঝোঁক সৃষ্টি হয়। পরকালের শাস্তির ভয়ে দুচোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হয়।

মাওলানা লক্ষীপুরী এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার বায়তুল্লাহ শরিফ জিয়ারতের সৌভাগ্য লাভ করেছেন। তিনি শ্বেতী (ধবল) রোগে আক্রান্ত। এই রোগ নিয়ে সাধারণের মনে অনেক কুসংস্কার আর ভ্রান্তি আছে। তবে এটি কোনো ছোঁয়াচে বা অভিশপ্ত রোগ নয়। ১৯৮২ সালে পবিত্র হজপালনে গিয়ে আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে দোয়া করেন ‘হে আল্লাহ! তুমি সাদা রঙ কালো রঙ সব রঙের সৃষ্টিকর্তা, হয়তো তুমি আমার সারা শরীর কালো করে দাও, না হয় সাদা করে দাও।’ আল্লাহতায়ালা তার প্রিয় বান্দার দোয়া কবুল করলেন। তার শরীর সাদা রঙে পরিবর্তন হয়ে যায়। হজ থেকে আসার পর তাকে কেউ চিনতেই পারেননি। পূর্বের লক্ষীপুরী আর এখনকার লক্ষীপুরীর মধ্যে অনেক ব্যবধান। এখন আর তিনি শ্বেতী রোগী নন। মাওলানা লক্ষীপুরী ৮৫ বছর বয়সে ব্রেইন স্ট্রোক করেন। ডানপাশ অবশ হয়ে যায়, আল্লাহর রহমতে এখন তিনি কারও সাহায্য ছাড়া অনায়াসেই হাঁটতে পারেন। এগুলো কোনো অতিরঞ্জিত ঘটনা নয়। আসলে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অলৌকিক ঘটনাবলি সত্য।

মাওলানা মুহাম্মদ বিন ইদ্রিস লক্ষীপুরীকে দেখলে হৃদয়ে আলাদা প্রশান্তি আসে, তিনি একজন আল্লাহর অলি। তার খেদমতে গেলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়। আল্লাহর অলি ও ইলমে দ্বীনের মহান এই খাদেমের বয়স এখন ৯৯ বছর। বর্তমানে তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছেন। মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করি, তিনি যেন তাকে সুস্থতার সঙ্গে নেক ও বরকতময় হায়াত দান করেন-আমিন।

লেখক : সহ-সম্পাদক,কালান্তর ম্যাগাজিন


Thursday, June 4

কানাইঘাটে শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আব্দুল হক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

কানাইঘাটে শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আব্দুল হক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়


নিজস্ব প্রতিবেদক :

জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত মূল্যায়নে শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় ক্যাটাগরিতে কানাইঘাট উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে আব্দুল হক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

শিক্ষার মানোন্নয়ন, শৃঙ্খলা, শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং বিদ্যালয়ের সৌন্দর্য বর্ধনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিদ্যালয়টিকে এ গৌরবজনক সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে।

গত সোমবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদি হাসান শাকিল এবং উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহ মিফতাহুজ্জামান-এর যৌথ স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার খবরে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি, শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে আনন্দের আবহ বিরাজ করছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এ অর্জনের পেছনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও আন্তরিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জাহেদ হোসাইন রাহীন বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদান নয়, বরং শিক্ষার্থীদের দক্ষ, নৈতিক, যুগোপযোগী ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। এই স্বীকৃতি আমাদের সামনে আরও ভালো কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগাবে।”

তিনি বিদ্যালয়ের এ অর্জনে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতেও শিক্ষার মানোন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।