হাবিবুর রহমান:
কিছু মানুষ আমাদের জীবনে শুধু আত্মীয় হিসেবে থাকেন না; তাঁরা হয়ে ওঠেন আমাদের শৈশবের স্মৃতি, পারিবারিক গর্ব এবং জীবনের মূল্যবান এক একটি অধ্যায়। আমার তালই, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কমর উদ্দিন চৌধুরী, আমার কাছে তেমনই একজন মানুষ।
সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার এই মানুষটি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর মুক্তিযোদ্ধা আইডি নম্বর ০৭০৪০৯০২১৬। কানাইঘাটের মুক্তিযুদ্ধের একটি ঐতিহাসিক নথিতে তাঁকে ‘সি’ কোম্পানির কোয়ার্টার মাস্টার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ক্যাপ্টেন রবের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ করার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
ছোটবেলা থেকেই জানতাম, তালই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তবে তখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গভীরতা বোঝার মতো বয়স হয়নি। শুধু দেখতাম, কানাইঘাটে মানুষ তাঁকে কতটা সম্মান করত।
১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত কানাইঘাটে থাকার সময় নিজের চোখে দেখেছি—তিনি বাজারে গেলে মানুষ তাঁকে সম্মান করে সালাম দিত। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁকে মঞ্চে বিশেষ মর্যাদায় বসানো হতো। আমরা স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়ে কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নিলে তিনি উৎসাহ দিতেন, পুরস্কার তুলে দিতেন, আমাদের সঙ্গে কথা বলতেন।
তখন হয়তো বুঝতাম না, কিন্তু আজ বুঝি—সেই সম্মানের পেছনে ছিল একজন মানুষের দীর্ঘ জীবনের ত্যাগ, সাহস এবং মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গৌরবময় ইতিহাস।
আমার বাবার চাকরির সুবাদে ছোটবেলা থেকেই তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছি। পরে ২০০১ সালে তাঁর মেজ ছেলের সঙ্গে আমার বড় বোনের বিয়ে হলে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। ফলে তালই আমার কাছে শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন পরিবারের অত্যন্ত আপন একজন মানুষ।
২০০৭ সালের সেই ছবিগুলো:
এই ছবিগুলো ২০০৭ সালের। তখন তালই ক্যান্সারে আক্রান্ত। শরীর ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছিল। জীবনের শেষ সময়গুলো পার করছিলেন তিনি। কিন্তু অসুস্থ শরীরের বিপরীতে তাঁর মনের শক্তি ছিল অসাধারণ।
আমি তাঁর পাশে বসতাম। তিনি আমাকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনাতেন। কোথায় যুদ্ধ করেছেন, কীভাবে সেই কঠিন সময় পার করেছেন, কী ভয় ছিল, কীভাবে সেই ভয়কে জয় করেছেন, কী ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে—সবকিছু অত্যন্ত মন দিয়ে শুনতাম।
আজ এত বছর পর সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে উপলব্ধি করি, তখন আমি শুধু একজন আপন মানুষের গল্প শুনছিলাম না; আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার মুখে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের একটি অংশ শুনছিলাম।
আমার কাছে তখন একটি ছোট ক্যামেরা ছিল। সেই ক্যামেরায় তাঁর সঙ্গে কয়েকটি ছবি তুলে রেখেছিলাম। আজ এত বছর পর সেই ছবিগুলো যখন দেখি, তখন মনের ভেতর এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়।
মনে হয়, যদি আরেকবার তাঁর পাশে বসতে পারতাম! যদি আরেকবার বলতে পারতাম—‘তালই, মুক্তিযুদ্ধের গল্পটা আরেকটু বলেন।’
হয়তো আরও অনেক প্রশ্ন করতাম। আরও অনেক গল্প শুনতাম। আরও কিছু ছবি তুলে রাখতাম। কিন্তু সময় কাউকে দ্বিতীয়বার সেই সুযোগ দেয় না।
আত্মমর্যাদায় ছিলেন অনন্য:
তালইয়ের ব্যক্তিত্বের আরেকটি দিক আমাকে আজও গভীরভাবে নাড়া দেয়—তাঁর আত্মসম্মান।
ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসেও তিনি কারও ওপর বোঝা হয়ে থাকতে চাইতেন না। অসুস্থ শরীর নিয়েও নিজের মর্যাদা ও আত্মনির্ভরতার বিষয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন।
তখন হয়তো বিষয়টির গভীরতা পুরোপুরি বুঝিনি। আজ মনে হয়, একজন মানুষের চরিত্রের দৃঢ়তা সবচেয়ে ভালোভাবে প্রকাশ পায় তার কঠিন সময়েই। তালই সেই কঠিন সময়েও নিজের আত্মমর্যাদা ধরে রেখেছিলেন।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায়:
একসময় তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। কানাইঘাটে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয় এবং দেওয়া হয় গার্ড অব অনার। তাঁর শেষ বিদায়ে রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের অনেক গণ্যমান্য মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
সেই সময় সেখানে থাকতে পেরেছিলাম। আজও সেটি আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি হয়ে আছে।
একজন মানুষকে তাঁর জীবনের শেষ যাত্রায় রাষ্ট্রীয় সম্মান পেতে দেখা শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর অবদানের প্রতি রাষ্ট্র ও মানুষের শ্রদ্ধারও একটি প্রকাশ।
স্মৃতির পাতায় একজন মুক্তিযোদ্ধা:
সরকারি মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে। ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরেও তাঁর ছবি এবং ১৯৭১ সালের কিছু নথি সংরক্ষিত আছে।
তবে আমার কাছে তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান স্মারক কোনো নথি নয়। আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান হলো তাঁর সঙ্গে তোলা সেই কয়েকটি ছবি, তাঁর মুখে শোনা মুক্তিযুদ্ধের গল্প এবং তাঁর সঙ্গে কাটানো সময়গুলো।
আজ যখন সেই ছবিগুলো দেখি, তখন মনে হয়—একটি মানুষের জীবন কখনো শুধু তাঁর নিজের জীবন হয়ে থাকে না। তাঁর জীবন ছুঁয়ে যায় পরিবারকে, সমাজকে এবং কখনো কখনো একটি দেশের ইতিহাসকেও।
আমার তালই আমাকে শিখিয়েছেন, দেশকে ভালোবাসা শুধু কথার বিষয় নয়; মানুষের সম্মান অর্জন করতে হয় কাজের মাধ্যমে। কঠিন সময়েও নিজের আত্মমর্যাদা ধরে রাখতে হয়। আর জীবনের অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।
তালই আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তিনি হারিয়ে যাননি।
তিনি আছেন আমাদের স্মৃতিতে, তাঁর পরিবারের ভালোবাসায়, মানুষের শ্রদ্ধায় এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা তাঁর পরিচয়ে।
আমার তালই, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কমর উদ্দিন চৌধুরী—আপনি আমার পরিবারের গর্ব, আমার শৈশবের একটি অমূল্য স্মৃতি এবং আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধকে কাছ থেকে অনুভব করার একটি জীবন্ত অধ্যায়।
মানুষ একদিন চলে যায়। কিন্তু কিছু মানুষ চলে গিয়েও থেকে যান—ছবিতে, গল্পে, স্মৃতিতে এবং ইতিহাসে।
তালই, আপনাকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি।
আল্লাহ আপনাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
লেখকের পরিচয়: হাবিবুর রহমান ,বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের মানুষ। তিনি রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (RUET) থেকে পড়াশোনা করে উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানিতে যান এবং মিউনিখের Technical University of Munich (TUM)-এ মাস্টার্স করেন। বর্তমানে তিনি জার্মানিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পেশায় যুক্ত।
২০১২ সালে মিউনিখে নাতালিয়ার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে তাঁদের বিয়ে হয়। তাঁদের দাম্পত্য জীবন ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের গল্প নিয়ে “Natalia & Habib সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।




