Showing posts with label মতামত. Show all posts
Showing posts with label মতামত. Show all posts

Thursday, June 25

মাধবীলতার সংসার : প্রেম, দ্রোহ ও জীবনবোধের কাব্য

মাধবীলতার সংসার : প্রেম, দ্রোহ ও জীবনবোধের কাব্য


সরওয়ার ফারুকী:

মাধবীলতার সংসার—কবি সালেহ আহমদ খসরুর তৃতীয় বই, দ্বিতীয় কাব্য। নানান রঙের অনুভব ও অনুভূতিকে কবি রূপকার্থে মাধবীলতার সঙ্গে মিলিয়ে এ কাব্য গেঁথেছেন। বাগান যেমন একটি ফুলের ডালি দিয়ে গড়ে ওঠে না, জীবনও তেমনি—সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, দ্রোহ-আনুগত্যসহ বহুমাত্রিক অনুভূতির এক বৃহৎ সংকলন। মাধবীলতার রূপে কবি সালেহ আহমদ সেই অনুভূতিগুলোর সংসার গড়েছেন এ কাব্যে।


বিচ্ছেদাশ্রিত প্রেমানুভূতি নিয়ে এ কাব্যের সূচনা। শিরোনাম কবিতা ‘মাধবীলতার সংসার’ গ্রন্থাশ্রিত অনুভূতির এক পূর্ণাঙ্গ সংসার নির্মাণের মধ্য দিয়ে কাব্যের সুন্দর সমাপ্তি ঘটিয়েছেন। ২৪-০৪-২০২৫ তারিখে রচিত কাব্যের প্রথম কবিতা ‘ফিরে আসি পৃথিবী ছেড়ে’; আর ২১-০৯-২০২৫ তারিখে রচিত শেষ কবিতা ‘মাধবীলতার সংসার’। মাত্র পাঁচ মাসের সাধনায় কবিতার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পঁয়ষট্টিতে। কবিতার আকুতি প্রাণে না ঝরলে কাব্যের সংসার পাতবার জন্য এ ক’মাস সময় যথেষ্ট নয়। কবি খসরুর প্রাণে যে কবিতার উথাল-পাথাল ঢেউ, দ্রুতগামী অশ্বের মতো কাব্যের প্লাবন যে তার বুক জুড়ে ওঠছে—এ তারই প্রমাণ।

 

এ কাব্যের প্রাণ মূলত প্রেম। তবুও কাব্যে শুধু প্রেম নয়; আছে বিচ্ছেদের অশ্রু, দ্রোহের আগুন, অবিশ্বাসের দাগ, সন্দেহের বীজ, বিশ্বাসের শক্তি, পুতুলনাচের নাটাই, বৃষ্টিমুখর ভোর, সন্ধ্যারাতের তারা, অন্ধকারের দ্বন্দ্ব, মাটির মোহ ছাড়াও দেশপ্রেমের আবেশ আছে—সর্বোপরি জীবনবোধের বর্ণিল প্রকাশ আছে।

 

কবি যখন হাঁটেন, কথা বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যস্ত থাকেন, স্লোগানে স্লোগানে পাথর ভাঙেন—তখনও তিনি ভেতরে ভেতরে একাকীত্বে ভোগেন। এই একাকীত্ব কবিকে মহাজাগতিক বিস্তারে উড়িয়ে নিয়ে যায়; তিনি তখন অদ্ভুত সব কল্পচিত্র আঁকেন। কবি ও অকবিদের এখানেই এক অবধারিত অন্তরায়। এই অন্তরায়ের এপারে পাঠক, ও পারে কবি।

 

কবি সালেহ আহমদ খসরু বহুমাত্রিক চরিত্র। লেখক-পরিচয়ে প্রকাশক যথার্থই বলেছেন—“সালেহ আহমদ খসরু বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী ব্যক্তিত্ব; একাধারে কবি, সমাজচিন্তক, বাচিকশিল্পী এবং তুখোড় রাজনীতিবিদ। তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা তাঁকে স্বতন্ত্র পরিচয়ে উদ্ভাসিত করেছে। তাঁর দরাজ কণ্ঠ সিলেটের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।”

 

মাধবীলতার সংসার কাব্যে কবি খসরু কল্পদৃষ্টিতে যে চিত্রমালা এঁকেছেন, তা তাঁকে স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করেছে। প্রেম থেকে অগ্নি, ফুল থেকে ঘ্রাণ, প্রাণ থেকে যৌবন আহরণ করতে যে সাংসারিক দৌড়ঝাঁপের প্রয়োজন, কবি এ কাব্যে তার সবটাই ঢেলেছেন। নাকফুলের খোঁজে পথে নেমেই কবি দীঘল বাঁকের উর্মিমালায় ঘোমটাপরা আঁখির দেখা পান; বুকের ভেতর অনুভব করেন অল্পস্বল্প অম্লমধুর টান। আবার গহিন-গভীর অন্ধকূপের পানশালায় বেহিসেবি, বেশুমার শরাব-বিলাসেও মত্ত হন।

 

এ কাব্যে কবি খসরুর তাড়াহুড়োর ছাপ রয়েছে। এ ছাপ অস্পষ্ট নয়; বরং এ তাড়াহুড়োই হয়তো কবির স্মারক হিসেবে তাঁকে আগামীতে চিহ্নিত করতে ভূমিকা রাখবে। কবিতার চিরায়ত যে রূপ, মাধবীলতার সংসার কাব্যে তা অনেকটাই ম্রিয়মাণ। ছন্দ, মাত্রা ও অন্ত্যমিলের যে ঐতিহ্যিক রূপ, এ কাব্যে সচেতনভাবেই কবি তার আশ্রয় নেননি; অনেকটাই ইচ্ছাস্বাধীন থেকেছেন। কবি নিজে একজন খ্যাতিমান বাচিকশিল্পী; যেকোনো কবিতা পাঠে তিনি নিজেকে সেভাবেই সঁপে দেন। সম্ভবত এ কারণেই তাঁর কবিতায় ঐতিহ্যিক ধারার বিপরীতে একটি খাপছাড়া স্বতঃস্ফূর্ততা থেকেছে। এ কবির দুর্বলতা, না স্বকীয়তা—সে বিচার অনাগত দিনের পাঠকরা করবেন।


কবি সালেহ আহমদ খসরু ১৯৫৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। পুলিশ পরিদর্শক বাবার চাকরির সুবাদে সিলেটের এ কবির জন্ম হয়ে সাতক্ষীরা জেলায়। কবির আদিনিবাস বিয়ানীবাজার উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের চন্দরপুর গ্রামে। বর্তমানে সিলেট শহরের আম্বরখানার চাষনীপীর রোডে বসবাস করছেন।

 

এ বই ছেপেছে দোআঁশ, রঙমহল টাওয়ার, সিলেট। দোআঁশ ইতিমধ্যে সিলেটের প্রকাশনা শিল্পে নানন্দিক চর্চায় সুনাম কুড়াচ্ছে, যদিও মাধবীলতার সংসার কাব্যের প্রচ্ছদ অতটা আকর্ষণীয় নয়!