Showing posts with label ইতিহাস. Show all posts
Showing posts with label ইতিহাস. Show all posts

Tuesday, January 3

 পূর্ণ হলো সিলেট জেলার ২৩৪ বছর

পূর্ণ হলো সিলেট জেলার ২৩৪ বছর


কানাইঘাট নিউজ ডেস্ক: জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠার ২৩৪ বছর পূর্ণ হলো সিলেটের। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৭৮২ সালের ৩ জানুয়ারি সিলেট জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তখন সেটি ছিল বঙ্গপ্রদেশের অধীনে। এরপর ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত ছিল বঙ্গপ্রদেশের অধীনে। এরপর ১৮৭৮ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত ছিল আসামপ্রদেশের অধীনে। পরে সিলেট জেলা পূর্ব পাকিস্তানের অধীনে চলে যায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে এখন পর্যন্ত অলি আউলিয়ার পাদস্পর্শে ধন্য সিলেট। উইকিপিডিয়াসূত্রে জানাযায়, উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের একটি প্রধান শহর, একই সাথে এই শহরটি সিলেট বিভাগের বিভাগীয় শহর। এটি সিলেট জেলার অন্তর্গত। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন এলাকাই মূলত সিলেট শহর হিসেবে পরিচিত। সিলেট ২০০৯ সালের মার্চ মাসে একটি মেট্রোপলিটন শহরের মর্যাদা লাভ করে। সুরমা নদীর তীরবর্তী এই শহরটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপুর্ণ শহর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন্ডিত এ শহরটি দেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী হিসেবে খ্যাত। সিলেট বাংলাদেশের সবচেয়ে ধনী জেলা হিসেবে পরিচিত। শিল্প, প্রাকৃতিক সম্পদ ও অর্থনৈতিক ভাবে সিলেট দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ধনি জেলা। জৈন্তিয়া পাহাড়ের অপরূপ দৃশ্য, জাফলং এর মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য, ভোলাগঞ্জের সারি সারি পাথরের স্তুপ পর্যটকদের টেনে আনে বার বার। এ শহরের বিশাল সংখ্যক লোক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাস করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণ করে দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। সিলেটের পাথর, বালুর গুণগতমান দেশের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। এখানকার প্রাকৃতিক গ্যাস সারা দেশের সিংহভাগ চাহিদা পূরণ করে থাকে। স্বাধীনতা যুদ্ধে এ জেলার ভূমিকা অপরিসীম। জেনারেল এম,এ,জি ওসমানী এ জেলারই কৃতী সন্তান। হযরত শাহজালাল (র.) ও হযরত শাহ পরান (র.) এর পবিত্র মাজার শরীফ এ জেলায় অবস্থিত। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক ধর্মপ্রাণ লোক মাজার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে আগমন করে। আসে বিপুল সংখ্যক পর্যটক। সিলেট এর স্থানীয় ভাষা ‘সিলটি ভাষা’র একটি বিশেষত্ব রয়েছে যা অন্য অঞ্চল থেকে পৃথক। এ ছাড়া নাগরী বর্ণমালা নামে সিলেটের নিজস্ব বর্ণমালা ও রয়েছে। শীত মৌসুমে সিলেটের হাওর-বাওর গুলো ভরে ওঠে অতিথি পাখির কলরবে।
 তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া,সিলেটভিউ২৪ডটকম ও ইন্টারনেট।

Sunday, January 1

কানাইঘাটের নামকরণ ও সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

কানাইঘাটের নামকরণ ও সংক্ষিপ্ত ইতিহাস


মুহাম্মাদ আবু শুরাইম:
 রাসুলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা জমির নাম সমূহ থেকে শিক্ষা গ্রহণ কর। (বায়হাকী, আল-কামিল লিবনি আদী, ফয়জুল ক্বাদীর, ১ম খণ্ড, হামযা অধ্যায়)। মূল নিবন্ধ শুরু করার আগে প্রণিধানযোগ্য, কানাইঘাটের ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে সবার জন্য প্রশ্নোত্তর ও তর্ক-বিতর্ক করার সমান অধিকার রয়েছে। কারণ এর দ্বারা প্রকৃত বিষয়ের উন্মেষ ঘটে। কাল পরিক্রমায় কানাইঘাট বাজার এখন
Corporation বা পৌরসভা। কানাইঘাট একটি প্রাচীনতম জনপদ হলেও ইতিহাসবেত্তাদের অভিমত হচ্ছে যে, এর কোন প্রামাণ্য ইতিহাস নেই। বিচ্ছা-কিংবদন্তি, স্মৃতি-শ্রুতি, শিলালিপি ও সম্ভাব্য ট্যুরিস্টদের সফরনামাসহ ইতিহাসের অন্যান্য উৎস নিদর্শনাবলীর মাধ্যমে কানাইঘাট সম্পর্কে কিছু দুর্বল তথ্য পাওয়া যায়। মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় লেনদেন-আদান প্রদানের প্রয়োজনে গড়ে উঠেছে হাট-বাজার, শহর-নগর, গঞ্জ-বন্দর। এই সবের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, প্রাথমিক পর্যায়ে শহর-বন্দর ও পৌরসভা ইত্যাদি শুরু হয়েছে মামুলি বাজার বা গঞ্জ থেকে। এসবের সাথে জড়িয়ে আছে প্রতিষ্ঠাতা কিংবা অন্য কারো নাম। যেমন: কাজির বাজার, মৌলভী বাজার, গোলাপগঞ্জ, উমরগঞ্জ প্রভৃতি। কানাইঘাট পৌরসভার পত্তনও শুরু হয়েছিল সম্ভবতঃ একটি হাটের মাধ্যমে। কানাইঘাট নামের প্রকৃত উৎস সম্বন্ধে রয়েছে নানা বৈচিত্র ও মতভিন্নতা। কোন সুদূর অতীতে কানাইঘাট নামের সূচনা হয়েছিল তা এখন আর সঠিকভাবে বলা সম্ভব হচ্ছে না। ঐতিহাসিকদের মতে ‘কানাই মাঝির’ নামে নামকরণ হয়েছে কানাইঘাট। এ কানাই মাঝি খেয়াপারের মাঝি নাকি সমাজপতি মাঝি ছিলেন? এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেননা বাংলাদেশের দক্ষিণ -পশ্চিমাংশে কোন কোন জায়গায় সমাজের প্রভাবশালীদের উপাধি ছিল মাঝি। আমাদের এলাকায় খেয়াপারাপারকারী এবং নৌকা চালকদের মাঝি বলা হয়। ১৯৮২ ইং সনে প্রকাশিত একটি ম্যাগাজিনে কানাইঘাটের তৎকালীন থানা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন যে, ‘কানাই মাঝি’র নামে কানাইঘাটের নামকরণ হয়েছে। কিন্তু তিনি এর স্বপক্ষে কোন দলীল পেশ করতে পারেননি। ঘাটের সাথে মাঝির সম্পর্কের কারণে আমরা বোধ করি যে, কানাই মাঝি খেয়াপারাপারের মাঝি ছিলেন। অন্য দিকে এ নিয়েও মতবিরোধ আছে যে, কানাই মুসলমান না হিন্দু? তবে বেশিরভাগ জনশ্রুতি রয়েছে যে, কানাই মাঝি হিন্দু ছিলেন। প্রাচীন সভ্যতা স্মৃতিগন্ধময় প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান সিলেটের কানাইঘাট উপজেলা। যদি স্মৃতি বিজড়িত এ স্থানের নামকরণ খেয়াপারের মাঝি কানাইর নামানুসারে হয়ে থাকে, তাহলে তিনি যেন স্মরণীয় হয়ে থাকলেন। তার বিস্তারিত পরিচয় জানতে পারলে নিশ্চয় আমরা আরো খুশি হতাম। তবে যারা বলেন, খেয়াপারের মাঝি কোন দিন এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি হতে পারেনা বিধায়, কানাই মাঝির নামানুসারে কানাইঘাট নামকরণ হতে পারেনা। আমরা তাদের সাথে একমত নই। কারণ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হরেক রকম জাতি-উপজাতি, পেশাজীবী মানুষের বাস। তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি হিসাবে কোন কিছুর নামকরণও করে থাকে। কানাইঘাট নামের উৎস সম্পর্কে বিবিধ স্থান ও ভাষার শব্দ আলোচিত হতে পারে। যেহেতু স্থানান্তরিত এবং পর্যটন হচ্ছে মানব সভ্যতার একটি   nature তাই কানাইঘাটে পৃথিবীর অন্যান্য দেশ বা অঞ্চলের মানুষের আসা-যাওয়াটা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাদের ভাষায় নাম রাখতে পারে। জনশ্রুতি আছে যে, বর্তমান কানাইঘাট বাজারের তীরবর্তী সুরমা নদীর ঘাটে কানাই নামাক একজন মাঝির নামানুসারে কানাইঘাট নামকরণ করা হয়। মতান্তরে কানাইঘাট উপজেলার মুলাগুল এলাকার কানাই চৌধুরী নামক জৈন্তা রাজ-দরবারের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নামানুসারে কানাইঘাট উপজেলার নামকরণ করা হয়। আল্লাহ পাকই ভালো জানেন। যদি প্রত্নতাত্ত্বিকগণ আমাদের কানাইঘাটে নিয়ে আসা হয়, তাহলে হয়ত তারা বলবেন, এই অঞ্চলের মাটি হাজার হাজার বছরের পুরোনো। আজ থেকে বহু বহু বছর আগে কানাইঘাটের ভূপৃষ্ঠ ঠিক এই রকম ছিল না। খৃষ্টপূর্ব এত এত শতকে বর্তমানের সুরমা নদীর তীরে সু-সভ্য জনমানুষের বসতি ছিল। সম্ভবত বড় বড় ভূমিকম্প, বন্যা-প্লাবন আর নদী ভাঙ্গনের ফলে কোন সময়ে কানাইঘাটে ভূপ্রকৃতির বড় রকমের ওলট-পালট ঘটে। কানাইঘাটের যত মাঠ-ঘাট, নদী-নালা আর জনবসতি প্রভৃতি তার সবই প্রাকৃতিক কারণে বদলে গেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। এখনও দেখা যায় সুরমা নদী পাড়ের জমি, ঘর-বাড়ি, গ্রাম, রাস্তা-ঘাট ভাঙ্গছে। আবার বিশাল নদীর অন্যদিকে বিস্তীর্ণ চর পড়ছে। হাজার হাজার বছর আগে থেকেই এই ভাবে চলে আসা ভাঙ্গা-গড়ায় মাটিচাপা পড়ে যায় এক একটি নগর-জনপদ। হয়ত মাটি খনন করে প্রাচীন নিদর্শনাবলী পাওয়া যাবে যদ্দারা বিশেষজ্ঞগণ ধারণা করতে পারবেন যে, এই স্থানটি এত হাজার বছরের পুরানো এবং ঐতিহাসিকগণ বলে দিবেন সুরমা নদী হয়ে অমুক জায়গার মধ্য দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য চলত। কানাইঘাট নামের আরেকটি কিংবদন্তী রয়েছে। আর তা হচ্ছে কানাইঘাটের মূল উৎপত্তি স্থলে কানাই নামক একটি মন্দির ছিল যাকে কানাই মন্দির বলা হত এবং মন্দিরের পাশে খেয়াঘাট থাকার দরুন গোটা থানার নাম কানাইঘাট পড়ে যায়। 
লেখক:খাদিম,প্রকাশনা ও গবেষণা বিভাগ,জামেয়া আহলিয়া মুহসিনিয়া দারুল হাদীস সুরইঘাট।
চলবে.....
 (সূত্র. জেলা, উপজেলা ও নদ-নদীর নাম করণের ইতিহাস, সিলেট জেলা পর্ব, কানাইঘাট উপজেলা উইকিপিডিয়া, সাপ্তাহিক কানাইঘাটের ডাক ২০১৪ খ্রীষ্টাব্দ, শিণ ৬ষ্ঠ সংখ্যা ইত্যাদি)

Friday, July 29

ময়মনসিংহে জমিদারদের ঐতিহ্য আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল

ময়মনসিংহে জমিদারদের ঐতিহ্য আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল


ময়মনসিংহ: ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার জমিদারদের যে সকল স্থাপনা এখনো পর্যটকদের কৌতুহল জাগায় তার মধ্যে আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল (বর্তমানে টিচার্স ট্রেনিং কলেজ), শশী লজ (বর্তমানে মহিলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ) অন্যতম। আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল লোহার কুঠি বলে পরিচিত। বাড়িটি তৈরি করতে লোহার পরিমাণ বেশি লাগায় এই নামকরণ। ১৮৭৯ সালে ৪৫ হাজার টাকা ব্যয়ে এ জমিতে নির্মাণ করা হয় বাংলো আদলের সুরম্য বাগানবাড়ি লোহার কুঠি বা ‘আলেকজান্দ্রার ক্যাসেল’। মহাত্মা গান্ধী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহসহ অনেক জমিদার ও রাজপরিবারের সদস্যরা আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল মহারাজ শশীকান্তের আমন্ত্রণে ময়মনসিংহ আসেন। পৃথিবী বিখ্যাত বহু ব্যক্তি এই বাড়িতে রাত কাটিয়েছেন। কিন্তু পরে রবীন্দ্রনাথ স্মৃতি বিজড়িত এ ক্যাসেলের শ্বেত পাথরগুলো একে একে খোয়া যায়। স্মৃতির সঙ্গে এই প্রতারণাপূর্ণ বুদ্ধি মানুষকে ব্যথিত করে। এই ব্যথা পেরিয়ে সামনে কিছু দূরেই বিরাট প্রাচীর ঘেরা ফটক। ফটক পেরুলেই ফোয়ারা। ফোয়ারার মাঝে নার্সি সাস ভঙ্গীর নারী মূর্তি। এটিই শশীলজ। আজ এই লজে নেই বিষ্ময়কর সেই মিউজিক্যাল সিঁড়ি। যা বেয়ে উঠতে গেলেই বেজে ওঠতো মধুময় সঙ্গীত। ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পে এ বাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে ধ্বংস হয়ে যায় মিউজিক্যাল সিঁড়ি। যার জন্য শশীকান্ত ব্যয় করেছিলেন তৎকালীন ৩ লক্ষ টাকা। জানা যায়,বীরেন্দ্র কিশোর শশীকান্ত নামে পরিচিত ছিলেন। তার নির্মিত শশী লজ এখনো অনেকর মনে বিস্ময় জাগায়। তিনি রাজা থেকে মহারাজা পর্যন্ত উপাধি পেয়েছিলেন। বাংলা ১৯২০ সালে বাংলার গভর্নর রোনাল্ড তাকে মহারাজা উপাধি দেন। তিনি ছিলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। এ বংশের জমিদারদের জন্যই ময়মনসিংহ শহর জমিদারদের শহর বলে পরিচিত। ময়মনসিংহে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসেছিলেন মহারাজ শশী কান্তের আমন্ত্রণে। ১৯২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি কবি ময়মনসিংহে আসেন। ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অবস্থান করেন। কবি গুরু সূর্যকান্তের বাগান বড়ি আলেকজান্দ্রা ক্যাসেলে অবস্থান গ্রহণ করেন। কবি গুরুর ময়মনসিংহে আগমন ময়মনসিংহবাসীর জন্য অসামান্য গৌরবের বিষয়।

Thursday, July 28

 সিলেট নামকরণ কি করে হলো

সিলেট নামকরণ কি করে হলো


কানাইঘাট নিউজ ডেস্ক: পাহাড়, হাওর আর বনের বৈচিত্র্য বিছিয়ে দেশের উত্তর-পূর্ব‍াঞ্চল আলোকিত রাখা সিলেটের নামকরণ নিয়ে রয়েছে নানা মত, মিথ আর উপকথা। এগুলোর কোনোটি হয়তো ধর্মীয় ইতিহাস থেকে উঠে আসা, কোনোটি আবার সম্পর্কিত স্থানীয় লোককাহিনীর সঙ্গে। সবচেয়ে প্রচলিত ধারণাটি হলো, শিলা মানে পাথর। আর প্রাথরের প্রাচুর্যের কারণেই এ এলাকার নাম সিলেট। এ ধারণার পালে আর একটু হাওয়া দিয়ে বলা হয়ে থাকে, সিলেট শব্দের অনুসর্গ সিল মানে শীল বা পাথর আর উপসর্গ হেট মানে হাট বা বাজার। প্রাচীনকাল থেকে এ জেলায় পাথর ও হাটের আধিক্য থাকায় শব্দ দু’টি মিলে সিলেট নামের উৎপত্তি। হিন্দু মিথ বলছে, কন্যা শীলাদেবীর নামে হাট স্থাপন করেন প্রাচীন গৌড়ের রাজা গুহক। তখন শিলার নামের সঙ্গে হাট জুড়ে নাম হয় শীলাহাট। কালক্রমে শিলাহাট থেকে সিলট, সবশেষে সিলেট নামটি টিকে যায়। পুরাণে বলা হচ্ছে, বিষ্ণু চক্রে খণ্ডিত সতীর শবদেহের যে ৫১টি খণ্ড উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে পতিত হয় তার মধ্যে দু’টি পড়ে সিলেটে। যেহেতু সতীর অপর নাম শ্রী। তাই এই শ্রী এর সঙ্গে হড্ড (হাড়) জুড়ে নাম হয় শ্রীহট্ট। যা পরে সিলেট নামে পরিচিতি পায়। বিষয়টাকে এভাবেও বলা যায়, শ্রী অর্থ প্রাচুর্য বা সৌন্দর্য, হস্ত অর্থ হাত। যেখানে শ্রী এর হস্ত পাওয়া গিয়েছিল তাই শ্রীহস্ত- যা কালের বিবর্তনে শ্রীহট্ট নাম ধারণ করে। তবে হযরত শাহ্জালালের ‘সিল হট যাহ্’ আদেশ থেকে সিলেট নামের উৎপত্তি বলেও ধারণা প্রচলিত আছে। সিলেটে আসার সময় পথে অনেক বড় বড় পাথর পড়ায় শাহজালাল আদেশ করেন-সিল হট যাহ (পাথর সরে যা)। ওই আদেশে পাথর খণ্ড সরে গেলে সিলহট নামটির জন্ম হয় যা পরে সিলেট নামে পরিচিতি পায়। শ্রীহট্ট শব্দের আর এক নাম সমৃদ্ধ হাট। এই সমৃদ্ধ হাট বহু আগে থেকেই ছিলো বর্ধিষ্ণু বাণিজ্য কেন্দ্র। প্রাচীন যুগে শ্রীহট্ট নামে প্রতিষ্ঠিত পৃথক রাষ্ট্র কিছুকালের জন্য ‘হরিকেল’ নামেও পরিচিত ছিল। সপ্তম শতাব্দীতে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং ভারত ভ্রমণের সময় এ এলাকাকে ‘শিলিচট্রল’ বলে উল্লেখ করেন। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে সিলেট এলাকায় মানুষের বসবাস বাড়তে থাকে। ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে গৌড় গোবিন্দকে পরাজিত করে হজরত শাহ্ জালাল সিলেট অধিকার করলে সিলেট চলে আসে মুসলমান সুলতানদের অধীনে। সুলতানী আমলে সিলেটের নাম ছিল জালালাবাদ। মহারাজা শ্রীচন্দ্রের পশ্চিমভাগ তাম্রলিপি থেকে জানা যায়, দশম শতাব্দীতে বাংলায় চন্দ্র বংশের রাজত্বকালে তিনি এ জেলা জয় করেছিলেন। তার অধীনে শ্রীহট্টমণ্ডল নামে প্রশাসনিক বিভাগ গড়ে ওঠে যা সামন্ত রাজাদের হাতে শাসিত হতো।এই শ্রীহট্টমণ্ডল থেকেই কালক্রমে শ্রীহট্ট বা সিলহেট, সবশেষে সিলেট নামের উৎপত্তি। একাদশ শতাব্দীতে মুসলিম পরিব্রাজক আল্ বেরুনীর কিতাবুল হিন্দ গ্রন্থে সিলেটকে ‘সীলাহেত’ বলে উল্লেখ করা হয়। ইংরেজ আমলেও কাগজ-পত্রে সিলহেট নামটির ব্যবহার ছিলো। তবে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে কাছাড় ইংরেজ অধিকারে এলে সেখানকার সদর স্টেশন শিলচর এর সঙ্গে পার্থক্য দেখাতে সিলহেট নামটিকে বেশি করে প্রচার করা শুরু হয়। ভৌগলিকভাবে মেঘালয়, খাসিয়া, জৈন্তিয়া আর ত্রিপুরার পাহাড়ের মাঝে বন ও বালুকাময় টিলার বিস্তৃত হাওরপূর্ণ এলাকাটিই বৃহত্তর সিলেট এলাকা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে, সুরমা-কুশিয়ারাসহ মোট ৪৪টি নদী বয়ে গেছে বৃহত্তর সিলেটের বুক চিরে। এগুলোর মধ্যে ১৮টিই সীমান্ত নদী-যেগুলো নেমে এসেছে খাসিয়া, জৈন্তা অথবা মেঘালয় পাহাড় থেকে। নদীবেষ্টিত এ জেলায় রয়েছে অনেক হাওর-বিল, ছোট বড় টিলা। টাঙ্গুয়া ‍আর হাইল হাওরের মতো নয়নকাড়া হাওর ছাড়াও দেশের সর্ববৃহৎ হাওর হাকালুকির অবস্থান সিলেটে। আছে, রেমা-কালেঙ্গা, সাতছড়ি আর লাউয়াছড়ার মতো অরণ্য, রাতারগুলের মতো জলাবন। ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত সিলেট প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদেও সমৃদ্ধ। এখানকার মাটি চা চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল, চুনাপাথর, কঠিন শিলা, বালুসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। (জাকারিয়া মন্ডল কর্তৃক সংকলিত)

Wednesday, January 20

বিলুপ্তির পথে ঢেঁকি

বিলুপ্তির পথে ঢেঁকি

বিলুপ্তির পথে ঢেঁকি
বগুড়া প্রতিনিধি: গ্রাম বাংলার চির চেনা ঢেঁকি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। বর্তমান যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে মানুষ যন্ত্রের যাঁতাকলে  আবদ্ধ মানুষ সময়ের বিবর্তনে হারাতে বসেছে হাজার বছরের পরিচিত এই শিল্পটি। আগের যুগে ঢেঁকির ব্যবহার  ছিল অনেক জনপ্রিয়। সাধারণত ধান থেকে চাল আলাদা করা, বাহারী পিঠা তৈরির জন্য চাল গুঁড়া করা ইত্যাদি  নানা কাজে এটির ব্যবহার ছিল প্রসিদ্ধ।  

Friday, September 19

বিক্রমপুর জাদুঘর

বিক্রমপুর জাদুঘর


বিক্রমপুর জাদুঘরে স্থান পেয়েছে বিক্রমপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রত্নতাত্তি্বক নিদর্শন। ঘুরে এসে লিখেছেন- গাজী মুনছুর আজিজ 
সবুজ গাছগাছালিতে ঢাকা চারপাশ। তার মাঝে বিশাল পুকুর। শানবাঁধানো ঘাটও আছে। আরও আছে সাম্পান নৌকা। পুকুর পাড়ে অনেকগুলো পুরনো বাড়ি। কিছু বাড়ি পরিত্যক্ত। কিছু বাড়িতে লোকজন আছেন। আর এ পুকুরপাড়েই পুরনো বাড়িগুলোর পাশে গড়ে তোলা হয়েছে বিক্রমপুর জাদুঘর। এছাড়া পুকুরে যে সাম্পান নৌকা ভাসানো- এটি নৌকা জাদুঘরের প্রতীকী। আর এ জাদুঘরগুলো রয়েছে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার উত্তর বালাসুর গ্রামে। ১০ সেপ্টেম্বর এ জাদুঘরগুলো দেখতে গিয়েছি সেখানে। বিক্রমপুর জাদুঘর পোড়ামাটির খেলনাসহ অনেক প্রত্নতাত্তিক নির্দশন দেখা যাবে জাদুঘরে গুলিস্তান থেকে আরাম বাসে আরাম করে রওনা হই সকালে। বুড়িগঙ্গা পার হয়ে বাস যখন কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা অতিক্রম করছে, তখন থেকেই রাস্তার দুই পাশে দেখতে পেলাম কাশফুলের বাগান। যতদূর চোখ যায় শুধুই কাশফুল। সত্যিই দারুণ। ধলেশ্বরী সেতু পার হয়ে বাস চলে এগিয়ে। রাস্তার দুই পাশে তখন শুধুই বিল আর বিল। ঘণ্টা দেড়েকের মাথায় বাস এসে থামল বালাসুর বাজারে। নেমে হালকা নাশতা সেরে এখানকার সামাদ ভাইয়ের দোকানে গরুর দুধের চা খেলাম পরপর দুই কাপ। দারুণ স্বাদ। তারপর রিকশায় রওনা হই জাদুঘরের দিকে। ১৫ মিনিটের মাথায় এসে নামলাম জাদুঘরের সামনে। অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন নামের সংগঠন বিক্রমপুর জাদুঘর ও নৌকা জাদুঘর দুটি প্রতিষ্ঠা করেছে। ২০ জুন বিক্রমপুর জাদুঘর দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। একই সঙ্গে নৌকা জাদুঘরেরও উদ্বোধন করা হয়। বিক্রমপুর জাদুঘর জাদুঘরে স্থান পাওয়া তালপাতায় লেখা পুঁথি বিক্রমপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রত্নতাত্তি্বক নিদর্শন সংরক্ষণের লক্ষ্যেই ১৯৯৮ সালের ২৪ এপ্রিল যাত্রা শুরু করে অগ্রসর বিক্রমপুর সংগঠনটি। লৌহজংয়ের কনকসারে পাঠাগার স্থাপনের মাধ্যমে শুরু হয় এর যাত্রা। সংগঠনের উদ্যোগে মুন্সীগঞ্জের মালপাড়ায় নির্মাণ করা হয়েছে গবেষণা কেন্দ্র। এছাড়া ক্রমান্বয়ে নেয়া হয়েছে অনেক উদ্যোগ। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- শ্রীনগরের রঘুরামপুর ও নাটেশ্বর গ্রামে প্রত্নতাত্তি্বক খনন করা। এসব খননে প্রচীন বৌদ্ধ বিহার আবিষ্কৃত হয়েছে। পাওয়া গেছে বহু প্রত্নতাত্তি্বক নিদর্শন। প্রত্নতাত্তি্বক সেসব নিদর্শন এবং সংগঠনের উদ্যোগে সংগ্রহ করা অন্যান্য নিদর্শন দিয়েই গড়ে তোলা হয়েছে বিক্রমপুর জাদুঘরটি। আর যেখানে জাদুঘরটি করা হয়েছে এটি জমিদার যদুনাথ রায়ের পরিত্যক্ত বাড়ি। অগ্রসর বিক্রমপুর এ বাড়িটি সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়ে করেছে এ জাদুঘর। তিনতলা ভবনের এ জাদুঘরে প্রবেশ করলেই দুই পাশে দেখা যাবে দুটি বড় মাটির পাতিল। নিচতলার বাঁ পাশের গ্যালারিটি যদুনাথ রায়ের নামে। এ গ্যালারিতে বিক্রমপুরের প্রাচীন মানচিত্র, রঘুরামপুর, নাটেশ্বরসহ বিক্রমপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া পোড়ামাটির নল, মাটির পাত্র, পোড়ামাটির খেলনাসহ প্রত্নতাত্তি্বক বিভিন্ন নিদর্শন রয়েছে। নিচতলার ডান পাশের গ্যালারিটি স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর নামে। এ গ্যালারিতে আছে ব্যাসাল্ট পাথরের বাটি, গামলা, পাথরের থালা, পোড়ামাটির ইট, টালি, বিক্রমপুরের নানা প্রত্নতাত্তি্বক স্থাপনার ছবিসহ বিভিন্ন নিদর্শন। বিক্রমপুর জাদুঘর সিরামিকের থালা স্থান পেয়েছে এ জাদুঘরে দ্বিতীয় তলার বাঁ পাশের মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারিতে দেখা যাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ছবি, ইতিহাস, দলিল, বই ও বিভিন্ন নমুনা। আর ডান পাশের গ্যালারিতে রয়েছে বিক্রমপুরে জন্ম নেয়া মনীষীদের জীবন ও কর্মের বৃত্তান্ত। আরও আছে কাগজ আবিষ্কারের আগে প্রাচীন আমলে যে ভূর্জ গাছের বাকলে লেখা হতো সে ভূর্জ গাছের বাকল, তালপাতায় লেখা পুঁথি, কাঠের সিন্দুক, পাকিস্তান আমলের মুদ্রা, তাঁতের চরকা, পোড়ামাটির মূর্তি, সিরামিকের থালাসহ প্রাচীন আমলে স্থানীয় মানুষের ব্যবহার্য বিভিন্ন নিদর্শন। এছাড়া তৃতীয় তলার গ্যালারি এখনও চালু হয়নি। বিক্রমপুর জাদুঘরের কর্মাধ্যক্ষ অধ্যাপক মোঃ শাহজাহান মিয়া বলেন, সামনে জাদুঘরে আরও নিদর্শন বাড়নো হবে। এছাড়া নৌকা জাদুঘরের সাম্পান নৌকাটি আনা হয়েছে চট্টগ্রাম থেকে। খুব শিগগিরই নৌকা জাদুঘরে যোগ হবে ভাগ্যকুলের জমিদারের প্রাচীন নৌকা। ধীরে ধীরে এ পুকুরে ভাসানো হবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নৌকাও। আর এ নৌকা জাদুঘরটি এদেশের প্রথম। এছাড়া অগ্রসর বিক্রমপুরের উদ্যোগে আগামী ২০ সেপ্টেম্বর মুন্সীগঞ্জের মালপাড়ায় চালু হবে জ্ঞানপীঠ স্বদেশ অন্বেষণ গবেষণা কেন্দ্র। আর লৌহজংয়ে এগিয়ে চলছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গ্রন্থ জাদুঘরের কাজ। বিক্রমপুর জাদুঘর নৌকা জাদুঘরের সাম্পান নৌকা জাদুঘর দেখে এলাম পুকুরের ঘাটে। পুকুর, গাছগাছালি, জমিদার বাড়ি- সব মিলিয়ে ছিমছাম ছায়াশীতল বালাসুর গ্রামখানি সত্যিই মায়াময়। কিছুটা সময় পুকুরঘাটে বসে তারপর এলাম উত্তর বালাসুর বাজারে। সেখান থেকে রিকশায় এলাম বালাসুর বাসস্ট্যান্ড বাজারে। দুপুরের খাবার খেলাম একটি হোটেলে। তারপর সামাদ ভাইয়ের এক কাপ চা খেয়ে আবার উঠলাম আরামে ঢাকার উদ্দেশে। প্রয়োজনীয় তথ্য : ঢাকার গুলিস্তান থেকে বালাসুরের উদ্দেশে আরাম বাস ছাড়ে কিছুক্ষণ পরপর। ভাড়া ৬৫ টাকা। সময় লাগবে প্রায় দেড় ঘণ্টা। বালাসুর নেমে রিকশায় যাওয়া যাবে জাদুঘরে। ভাড়া ২০ টাকা। খাওয়ার জন্য বালাসুর বা উত্তর বালাসুরে আছে কয়েকটি রেস্তোরাঁ। জাদুঘর খোলা থাকে সকাল ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত ও ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬ পর্যন্ত। সাপ্তাহিক বন্ধ বৃহস্পতিবার। ছবি : লেখক

Sunday, July 28

কমলগঞ্জের মণিপুরী জাদুঘর : তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি

কমলগঞ্জের মণিপুরী জাদুঘর : তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি

মৌলভীবাজার: রমজানের ঈদ শেষে ছুটি কাটাতে বা সময় কাটাতে চলে আসতে পারেন কমলগঞ্জে। মৌলভীবাজারের গারো, মণিপুরী, চাশ্রমিক, খাসিয়া, সাওতাঁল নানা জাতিগোষ্টীর নৃতাত্ত্বিক সমন্বয়ে সমৃদ্ধ সবুজ জনপদ কমলগঞ্জ। 
ঢাকা থেকে ট্রেনে সরসরি কমলগঞ্জের ভানুগাছ অথবা শমসেরনগর ষ্টেশনে নামতে পারেন। যদি বাসে আসেন তবে  শ্রীমঙ্গল বা মৌলভীবাজার নেমে সেখান থেকে প্রাইভেট কার,ট্যাক্সি বা সি,এন,জি,যোগে চায়ের পাতার সুঘ্রাণ নিয়ে লাউয়াছড়ার বনারণ্যে পাখ-পাখালীর কুহুরব শুনে শুনে হামহাম, মাধবপুর লেক আর বর্ণিল সংস্কৃতির কমলগঞ্জে চলে আসা যায়। সেখানে হামহাম,মাধবপুর লেক,ক্যামেলিয়া ছাড়াও দেখে আসতে পারেন পৃথিবীর এক অনন্য ও অন্যরকম নৃতাত্বিক যাদুঘর কমলগঞ্জের মণিপুরী যাদুঘর।
এক উদাসীন কবি, লোক গবেষক ও মণিপুরী সংস্কৃতিকর্মী হামোম তনুবাবু মণিপুরী লোক সংস্কৃতির অতীত ঐতিহ্য ও নিদর্শন সামগ্রীর সমন্বয়ে কমলগঞ্জের আদমপুরের ছনগাও গ্রামে তার নিজবাড়িতে তৈরি করেছেন মণিপুরী জাদুঘর ‘চাউবা মেমোরিয়াল মণিপুরী ইন্টেলেকচ্যুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’। 
সনাতন ধর্মালম্বীদের মধ্যে মণিপুরী একটি সমৃদ্ধ জাতি গোষ্ঠী। যাদের রয়েছে বিশাল ইতিহাস। রয়েছে সমৃদ্ধ সংস্কৃতি। কিন্তু কালের ধারায় আজ তা প্রায় বিলুপ্ত। মণিপুরী সম্প্রদায়ের অনেক নতুন প্রজন্মরাও জানে না তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। এই বিষয়গুলোকে ধরে রাখতে কমলগঞ্জের সংস্কৃতিযোদ্ধা হামোম তনু বাবু শুরু করেন মণিপুরী ঐতিহ্যে লালিত প্রাচীন বিলুপ্ত প্রায় সামগ্রী সংগ্রহের কাজ। সংগৃহীত সামগ্রীর সমন্বয়ে তিনি গড়ে তোলেন মণিপুরী ঐতিহ্যের জাদুঘর। তনু বাবু তার বাবা চাউবাসিংহের স্মৃতি রক্ষায় এর নামকরণ করেছেন ‘চাউবা মেমোরিয়াল মণিপুরী ইন্টেলেকচ্যুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’। পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গল থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জাদুঘর। 
শুরুতেই জেনেছি শ্রীমঙ্গল বা মৌলভীবাজার থেকে প্রথমে যেতে হবে কমলগঞ্জের উপজেলা চৌমুহনী ময়না চত্বরে। সেখান থেকে আদমপুর বাজার হয়ে নিভৃতপল্লী ছনগাও গ্রামে তনু বাবুর বাড়ি। হামোম তনুবাবু নিজের ছায়া ঘেরা বাড়িতেই প্রতিষ্ঠা করেছেন এই জাদুঘর। ২০০৭ সালের ১২মে মণিপুরী বিভিন্ন ঐতিহ্য ও নিদর্শন দিয়ে সাজানো এই জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট কবি ও গবেষক নুরুল হুদা। সেদিন আগত অতিথিরা আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছিলেন ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক এই পরিবেশনা দেখে। এর আগে ২০০৬ সালের ১ অক্টোবর এ জাদুঘরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন গণমানুষের কবি দিলওয়ার। এরপর থেকে সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায় তনু বাবু ধীরে ধীরে চালিয়ে যাচ্ছেন তার সংগ্রহ ও তা জাদুঘরে সংরক্ষণের কাজ। তনু বাবুর আর্থিক অসচ্ছলতা রয়েছে। এগুলো সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন বিশাল অর্থ ও সময়। নিজের সংসার পরিচালনার পর অতিরিক্ত বোঝা টানা তার পক্ষে খুবই কষ্টসাধ্য। তবুও তার অদম্য সাহস ও মনোবল নিয়ে নিজের সংসার পরিচালনার ফাঁকে ফাঁকে চালিয়ে যাচ্ছেন এ কাজ। এই জাদুঘর পরিদর্শনকালে দেখা যায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হলেও জাদুঘরের জন্য কোনো ঘর তৈরি করতে পারেননি তনু বাবু। নিজের থাকার ঘরের একপাশ ছেড়ে দিয়েছেন জাদুঘরের জন্য। প্রায় ২৮০ স্কয়ার ফুটের একটি কক্ষে গাদাগাদি করে রাখা মণিপুরীদের প্রাচীন সামগ্রী। 
এ সময় তনুবাবু জানান, তার জাদুঘরে ১১৬ প্রকারের দু’শতাধিক সামগ্রী আছে। জায়গার অভাবে এভাবেই রাখা। এ জাদুঘরে সংরক্ষিত বিভিন্ন প্রাচীন ঐতিহ্য ও নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে প্রাচীন যুগে মণিপুরীদের নিত্য ব্যবহার্য কাঁসা-পিতলের কলস, জগ গ্লাস, মগ, থালাসহ বিভিন্ন খাবারপাত্র, সোনা, রূপা ও বিভিন্ন প্রকার ধাতব পদার্থের তৈরি মণিপুরী মেয়েদের ব্যবহার্য বিভিন্ন ধরনের গহনা ও সাজসজ্জার উপকরণ, বাঁশ ও বেতের তৈরি বিভিন্ন ধরনের ঝুড়ি, চালুন, ডালা, খলই, ছাতা, হাত পাখা, টুপি, মাছ ধরার দুওড়, পলো, শুকনো খাবার রাখার পাত্র, কাঠের তৈরি চিরুনি, তাঁতে কাপড় বুননের সরঞ্জাম, তাঁতে বোনা বিভিন্ন রং ও নকশার শাড়ি, গামছা, শালসহ বিভিন্ন উৎসবে ব্যবহার্য বিভিন্ন ধরনের পোশাক, বসার টুল, কৃষিকাজে ব্যবহৃত উপকরণ, ঢোল, তবলাসহ গান গাওয়ার বিভিন্ন প্রাচীন বাদ্যযন্ত্রসহ মণিপুরী সম্প্রদায়ের ব্যবহৃত নিত্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বস্তু। যার অনেক কিছুই এখন বিলুপ্ত প্রায়। সংগ্রহশালায় মণিপুরী পোশাকগুলো খুব আর্কষণীয়। ইচ্ছে করলে দর্শক তনু বাবুর অনুমতি নিয়ে সে পোশাক গায়ে জড়িয়ে ছবিও তুলতে পারেন। তনু বাবুর এ জাদুঘর পরিদর্শনে কোনো ফি দিতে হয় না। সবার জন্য উন্মুক্ত। আর সপ্তাহের ৭ দিনই সকাল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে।
তনু বাবু জানান, তার এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হওয়ার পেছনে মূলত যে কাজটি করেছে তা হচ্ছে ২০০৬ সালে ঢাকায় বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাবের সেমিনার কক্ষে লোক বাংলা গবেষক দলের আয়োজনে ‘বাংলাদেশের লোক সংস্কৃতি শনাক্তকরণ ও মূল্যমান নির্ধারণ এবং মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ’ শীর্ষক একটি জাতীয় সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এই সেমিনারে মণিপুরী লোক সংস্কৃতির ওপর প্রবন্ধ উপস্থাপনের আমন্ত্রণ পেয়ে তনুবাবু বিভিন্ন মণিপুরী অধ্যুষিত এলাকা ঘুরে নানা তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া মণিপুরী লোক সংস্কৃতির অনেক ঐতিহ্য ও নিদর্শন এবং বিলীন হওয়ার পথে নিদর্শন তাকে অনুপ্রাণিত করে এবং তিনি এসব মূল্যবান অতীত ঐতিহ্য সংরক্ষণে উদোগী হন। নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় গড়ে তুলেন এই সংগ্রহশালা। ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক নিভৃত পল্লীতে মণিপুরী জাদুঘরটি পরিদর্শনে এসেছেন। হামোম তনু বাবুর প্রতিষ্ঠিত মণিপুরী জাদুঘরে স্থান পাওয়া ১১৬ প্রকারের প্রায় দুশতাধিক দ্রব্য দেখে জাদুঘর পরিদর্শনে আগতরা মুগ্ধ হয়ে ওঠেন।--ডিনিউজ

Monday, May 27

 হারিয়ে যাচ্ছে সিলেটের নাগরী ভাষা!

হারিয়ে যাচ্ছে সিলেটের নাগরী ভাষা!


সিলেটের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নিজস্ব স্বকীয়তার এক বড় উদাহরণ নাগরী ভাষা। বর্তমানে ভাষাটি অপ্রচলিত, নতুন প্রজন্মের কাছে অজানা। তবে এটি পৃথিবীর একমাত্র ব্যতিক্রম ভাষা, যার লিপি আছে অথচ ভাষাটি হারিয়ে গেছে।
এই নাগরী চর্চা ও গবেষণা হলে অনেক ইতিহাস ঐতিহ্যের সন্ধান পাওয়া যাবে। এমনটাই মনে করেন, সিলেটের নাগরী ভাষার গবেষক শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আশ্রাফুল করিম।
বিভিন্ন গবেষণামূলক প্রবন্ধ ও রচনা থেকে জানা যায়, হজরত শাহজালালের সঙ্গে ৩৬০ জন আউলিয়া সিলেটে আসেন। তারা মূলত বিভিন্ন দেশ ও এই উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল থেকে আসেন। তাদের ভাষা বাংলা ছিল না। তখন একটি ভাষার চর্চা শুরু হয়, যা নাগরী ভাষা নামে পরিচিতি লাভ করে। এর ব্যাপ্তি ছিল আসামের করিমগঞ্জ  থেকে সিলেট, কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ পর্যন্ত।
তবে অনেকেই ভুল করে নাগরী ভাষাকে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা ও বাংলা ভাষার একটি উপভাষা বলে মনে করে থাকেন।
এ ক্ষেত্রে ড. আশ্রাফুল করিম বলেন, ‘নাগরী আঞ্চলিক ভাষা ও বাংলা ভাষার একটি উপভাষা নয়। একটি স্বতন্ত্র ভাষা; যার লিপি আছে। রয়েছে আলাদা ব্যাকরণ।’
এর বিজ্ঞানসম্মত লিপিমালা রীতিমতো বিস্ময়কর বলে মন্তব্য করেন এই অধ্যাপক। কারণ আধুনিককালের ভাষাবিদরা ভাষাকে সহজ করতে যে পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করছেন প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ বছর আগে নাগরী লিপিতে তা করা হয়েছিল।
তিনি আরও জানান, ভাষাটি এতই সহজ যে, নারীরা মাত্র আড়াই দিনে শিখতে পারতেন। আর পুরষদের শিখতে লাগতো মাত্র একদিন। নারীরা গৃহস্থালির কাজকর্মের কারণে সময় কম পেতেন। তাই, আড়াইদিন, আর পুরুষরা গৃহস্থালির কাজ না থাকায় একদিনেই শিখে নিতেন।
জানা গেছে, এ ভাষার প্রচলন শুধু সিলেটেই সীমাবদ্ধ নয়, ভারতের আসাম, ত্রিপুরা এবং মেঘালয়ের বহু সংখ্যক লোকের মাতৃভাষা সিলেটি। এটি একটি প্রাচীন ভাষা।
ভাষাটির উৎপত্তির কারণ সম্পর্কে ড. আশ্রাফুল করিম বলেন, ‘ইসলাম প্রচারের জন্য এখানে ৩৬০ আউলিয়া নিয়ে হযরত শাহজালাল আসার পর ভাষাটি শুরু হয়। তখন হিন্দুরা সংস্কৃত আর মুসলমানরা আরবির প্রতি অনুরক্ত থাকায় তাদের একই ভাষায় নিয়ে আসতে এই ৩৬০ আউলিয়ার মধ্য থেকে একটি কমিটি করা হয়েছিল, যারা হিন্দু-মুসলমান সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি লিপি বের করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল সবার মধ্যে ইসলাম প্রচার।’
তিনি আরও বলেন, ‘সহজে শেখা যায় বলে ভাষাটি আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।’
এর কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘নাগরী ভাষার বর্ণগুলো আমাদের সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক গৃহস্থালি দ্রব্যের মতো হওয়ায় এটি শেখা ছিল সহজ। যেমন- লাঙ্গলের অনুরূপ বর্ণ আছে নাগরীতে।’
লন্ডনে সাম্প্রতিককালে ভাষাটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চর্চার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। সেখানে আরও চালু করা হয়েছে নাগরী লিপির ফন্ট।
ড. আশ্রাফুলের মতে, ‘ভাষাটি চর্চা ও গবেষণা হলে অনাবিষ্কৃত অনেক পুঁথি উদ্ধার সম্ভব; যার মাধ্যমে আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য নতুন করে বিনির্মাণ হবে।’
বিভিন্ন গবেষণামূলক গ্রন্থ ও প্রবন্ধ থেকে জানা গেছে, হালের অসংখ্য জনপ্রিয় গান রয়েছে, যেগুলো নাগরী লিপিতে লেখা হয়েছিল। যেমন- সৈয়দ শাহনূরের (১৭৩০-১৮৫৫) ‘অরিন জংগলার মাঝে বানাইলাম ঘর/ভাই নাই, বান্ধব নাই, কে লইব খবর’ কিংবা শিতালং শাহের (১৮০০-১৮৮৯) ‘অজ্ঞান মন, খুয়াইলায় মহাজনের ধন’ ইত্যাদি।
‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, এই ভাষার বর্ণ সহজে শেখা যেতো। সিলেটের নাগরী বর্ণমালায় বর্ণসংখ্যা ৩২টি। বর্ণগুলো হচ্ছে- আ ই উ এ ও ক খ গ ঘ চ ছ জ ঝ ট ঠ ড ঢ ত থ দ ধ ন প ফ ব ভ ম র ল ড় শ হ।
নাগরী ভাষার আরেক গবেষক ড. মোহাম্মদ সাদিক তার ‘সিলেটের নাগরী: ফকিরি ধারার ফসল’ গ্রন্থে ৩৩টি বর্ণের কথা বলেছেন।
এ নাগরী বর্ণমালায় দুষ্পপ্রাপ্য ১৫টি পাণ্ডুলিপি প্রকাশ করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনী সংস্থা উৎস প্রকাশন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘কেতাব হালতুননবী’, ‘কড়িনামা’, ‘চন্দরমুখী’, ‘সোনাভানের পুঁথি’, ‘মহব্বতনামা’ ইত্যাদি।
গবেষকদের মতে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সিলেটি ভাষাকে স্বীকৃতি না দিলে এবং এর প্রচলন না ঘটালে একসময় প্রাচীন এ ভাষাটি হারিয়ে যাবে। স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষার তালিকা থেকেও ছিটকে পড়তে পারে ভাষাটি। - বাংলানিউজ
0 কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদঃ ইতিহাস ঐতিহ্য একটি পর্যালোচনা (১ম পর্ব)

0 কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদঃ ইতিহাস ঐতিহ্য একটি পর্যালোচনা (১ম পর্ব)

শাহ নজরুল ইসলামহযরত শাহজালাল (রঃ) ৩৬০ আউলিয়ার স্মৃতি বিজড়িত পূণ্যভূমি সিলেট। বাংলা ও আসামের মিলন কেন্দ্র, সুরমা-কুশিয়ারা, খোয়াই, ইটাখাল, মনু, পিয়াইন নদী, টাঙ্গুয়া, হাইল, হাকালুকি হাওর বিধৌত খাসিয়া জৈন্তিয়া লাউড় মাধবকুন্ডের শৈল শ্রেণীর পাদদেশে বিস্তৃত দুটি পাতা একটি কঁড়ির শ্যামল সিলেট-ধনের দেশ, ধানের দেশ গানের দেশ ও প্রাণের দেশ। সুদূর ইয়েমেনের দীপ্ত দরবেশ হযরত শাহজালাল (রঃ) আজ থেকে সাতশত বছর আগে সিলেটে শুভাগমন করে মহানবী (সঃ) প্রতিষ্ঠিত মদীনা নগর রাষ্ট্রের অনুরূপ একটি ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে যে একটি উন্নত সভ্যতার পত্তন করেছিলেন তার দিপ্তি ছড়িয়ে পড়েছিল  সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। তারই স্মৃতিধন্য এই  সিলেট বাংলাদেশের সম্পদ, সৌন্দর্য সমৃদ্ধির প্রতীক, সুপ্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক এবং শিক্ষা সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতি চর্চার গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারে ধন্য। হযরত শাহজালাল (রঃ) এর আগমনের পর হতে সিলেটের বুকে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির লালন উপনিবেশিক যুগের পূর্ব পর্যন্ত যে ধারাবাহিকতায় বিকাশিত হচ্ছিল তা বিজাতীয় দুরভিসন্ধিতে বিঘ্নিত হয়। তাই স্বভাবতই সিলেট ভূমির বরেণ্য চিন্তাবিদরা হযরত শাহজালাল (রঃ) এর মিশনকে অব্যাহত রাখতে একটি সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন লালন করে আসছিলেন। তাঁদের সে লালিত স্বপ্নের ফসল রূপে ১৯৩৬ সন থেকে কাজ করছে কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ সিলেট। কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ ৭৬ বছরে পা রাখলো। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে এ অঞ্চলের সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চায় তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। আমাদের বিচক্ষণ পূর্বসূরীরা ১৯৩৬ খ্রি. ১৬ ই সেপ্টেম্বর এ প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন করেন। বৃটিশ অধিকৃত ভারত বর্ষের এ অঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠির জাগরণের ল্েয এবং সৃজনশীলতা ও মনন চর্চার জন্যই এর প্রতিষ্ঠা। এ জন্যে তাঁদের কঠোর পরিশ্রম ও সাধনা করতে হয়েছে। বহু চড়াই উৎরাই অতিক্রম করে সাহিত্য সংসদ আজ বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতিহ্যের অংশ। সিলেট অঞ্চলের সকল বুদ্ধিজীবী সাহিত্যিক সাংবাদিক, কবি, লেখক, রাজনীতিবিদ এ প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ও এত্থেকে উপকৃত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। সাধারণতঃ ব্যক্তির জীবনিতিহাস লেখা ও প্রচার করা হয়। কিন্তু ব্যাক্তিত্বের বিকাশে যে সব সংগঠন কিংবা সমিতি যুগযুগ ধরে কাজ করে এর ইতিহাস কদাচিৎ লিপিবদ্ধ হয়। সিলেট অঞ্চলের ইতিহাস ঐতিহ্য লালন ও বিকাশের মূল স্তম্ভ ও বিশাল বটবৃক্ষ। কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য লেখা হয়েছে। কঠোর পরিশ্রম ও সাধনার- এই কাজটি সম্পাদনা করেছেন কবি রাগিব হোসেন চৌধুরী। তাঁর রচিত ৪৮০ পৃষ্ঠার গ্রন্থটির নাম ‘সিলেটের শত বর্ষের ঐতিহ্য-কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ’ এটি-বিগত শত বর্ষের এ অঞ্চলের সাহিত্য সংস্কৃতিক আন্দোলনের এক নির্ভরযোগ্য বিশ্বস্থ দলীল। সংসদের বয়স ৭৬ হলেও সংসদ প্রতিষ্ঠার প্রোপট রচনার ইতিহাস আরো পূর্বের, এজন্য শতবর্ষের কথা বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে এ অঞ্চলের ইতিহাস ঐতিহ্যের সন্ধানী গবেষক সত্যসন্ধ লেখক মরহুম অধ্যাপক আসাদ্দর আলী লিখেছেন,‘ইতিহাসেরও যেমন ইতিহাস থাকে ঠিক তেমনি যে কোন দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান এবং পত্র-পত্রিকা পর্যন্ত তাদের নামকে গৌরবময় ইতিহাসের অঙ্গ হিসাবে অনন্তকাল পর্যন্ত স্বার্ণারে লিখিত থাকার মত ব্যবস্থা করে নেয়। ইতিহাস সৃষ্টিকারী এ জাতীয় একটি প্রতিষ্ঠানেরই নাম-‘কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, সিলেট, তার মুখপত্রের নাম মাসিক ‘আল্-ইসলাহাহ্’ এবং এ দু’এর প্রাণ পুরুষের নাম হলো- মুহাম্মদ নূরুল হক। একদা সিলেটবিবাগের কিছু সংখ্যক সংস্কৃতি প্রেমী বিজ্ঞ মুসলমান সিলেট শহরস্থ হিন্দু স¤প্রদায়ের ‘সাহিত্য পরিষদ’- এর ন্যায় নিজেদের  জন্যে পৃথক একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্যে নিদারুণভাবে প্রয়োজন অনুভব করেন। তারই ফলশ্র“তি স্বরূপ সিলেট শহরের বুকে ‘মুসলিম সাহিত্য সংসদ, সিলেট’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান শাহজালাল (রহঃ) এর দরগা শরীফের তৎকালীন মুতাওয়াল্লী সর-এ কওম জনাব আবু জাফর আব্দুল্লাহ সাহেবকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে ১৯৩৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তারিখে। প্রাথমিক অবস্থায় যে ১৭ জন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব এ প্রত্যিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং যাঁদেরকে নিয়ে ‘মুসলিম সাহিত্য সংসদ, সিলেট ’ এর প্রথম কার্যাকারী সমিতি গঠিত হয়েছিলো তারা হলেন– ১। বিশ্বখ্যাত মরমী কবি হাছন রাজার ঔরসজাত সন্তান স্বনামধন্য খানবাহাদুর দেওয়ান একলিমুর রাজা চৌধূরী কাব্য বিশারদ, এম.এল.এ., ২। এডভোকেট জনাব আশরাফ উদ্দীন মোহাম্মদ চৌধুরী এম.এল.এ., ৩। জনাব মোহাম্মদ মকবুল হোসেন চৌধূরী কাব্য বিশারদ, এম.এল.এ., ৪। সর-এ কওম জনাব আবু জাফর আব্দুল্লাহ, ৫। জনাব সৈয়দ আব্দুল হাফিজ, ৬। জনাব দেওয়ান ওহিদুর রাজা চৌধুরী, ৭। জনাব দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ এম.এ., ৮। জনাব সৈয়দ আমিরুল ইসলাম বি.এ., ৯। জনাব ইকবাল হোসেন,১০। জনাব শেখ মোহাম্মদ সিকন্দর আলী, ১১। জনাব মৌলভী মুহাম্মদ নূরুল হক, ১২। জনাব মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক, ১৩। জনাব আবু মুক্তাদির মোহাম্মদ রইস ১৪। জনাব আবু মোহাম্মদ আব্দুজ্জাহের ১৫। জনাব মোহাম্মদ আব্দুল বারী চৌধুরী বি.এ. ১৬।  জনাব আব্দুল হাই এবং ১৭। জনাব নূর উদ্দিন। ‘মুসলিম সাহিত্য সংসদ, সিলেট’ এর কার্যকারী সমিতির সিদ্ধান্তক্রমে পরবর্তীকালে যৌক্তিক কারণে সংস্থাটির পূর্বে ‘কেন্দ্রীয়’ শব্দটি সংযুক্ত হয় এবং সংস্থাটি শেষ পর্যন্ত ‘কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, সিলেট’ নাম ধারণ করে যা এখনও বলবৎ রয়েছে। উল্লিখিত ‘কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, সিলেট’- এর প্রথম কার্যকরী সমিতির ১১নং সদস্য হিসেবে যে মৌলভী মুহাম্মদ নূরুল হক সাহেবের নাম দেখা যাচ্ছে তাঁর জন্মস্থান বিশ্বনাথ থানার দশঘর গ্রামে; ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে জন্মেছিলেন তিনি। চলবে……

Sunday, May 19

দিনাজপুরের ইতিহাস

দিনাজপুরের ইতিহাস

বাংলাদেশে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রাজ্যারম্ভের সূচনায় সৃষ্ট আদি জেলা শহরগুলির অন্যতম পুরাতন শহর ছিল দিনাজপুর। বর্তমান দিনাজপুর জেলা পূর্বের সেই দিনাজপুরের সামান্য এক খন্ড মাত্র। আদি সেই দিনাজপুরের বৃহৎ একটি অংশ পড়েছে ভারতে।

সেই ব্রিটিশ আমালের কথা

পলাশী যুদ্ধের ৮ বছর পর ১৭৬৫ ঈশাব্দে ইংরেজ সেনাবাহিনী কর্তৃক অত্র এলাকা বিজিত হয় ফলে নবাবী শাসনের অবসানের সঙ্গে পতন হয় সাবেক রাজধানী ঘোড়াঘাট নগরের। তারপর থেকে গড়ে ঊঠতে শুরু করে দিনাজপুর শহর। ইংরেজ অধিকার পূর্ব যুগে প্রায় সমগ্র উত্তরবঙ্গ এলাকা নিয়ে গঠিত ছিল নবাব শাসিত ঘোড়াঘাট সরকার (জেলা) এবং সরকারের শাসনাধিকরণ ছিল ঘোড়াঘাট নগর। এই সরকারের সর্বশেষ মুসলমান ফৌজদার মীর করম আলী ইংরেজ সেনাপতি মিঃ কোর্টিল এর সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হন। ফলে ঘোড়াঘাট নগরসহ সমগ্র উত্তরাঞ্চল ইংরেজদের পদানত হয়। ঘোড়াঘাটের পতন হওয়ার ফলে বিজয়ী কোম্পানী সরকার কর্তৃক উত্তরবঙ্গ শাসনের জন্য যে বৃহৎ স্থায়ীজেলাটি গঠিত হয় (১৭৮৬) তার শাসনাধিকরণ বা জেলা শহর স্থাপিত হয় দিনাজপুর নামক মৌজায়। এই সূত্রে একই মৌজায় ইংরেজ আমলের জেলা শহরটিরও সূত্রপাত ঘটে বলে বিশেষজ্ঞগণের অভিমত। দিনাজপুরে স্থায়ী শাসনাধিকরণ স্থাপিত হওয়ার প্রায় শতাধিক বছর পরে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় দিনাজপুর পৌরসভা (১৮৬৯)। বিশেষজ্ঞগণের মতে আনুমানিক ১৯৮৬ ঈশাব্দে দিনাজপুর শহর এর ২০০ বছর পূর্ণ হয় এবং ১৯৬৯ ঈশাব্দে শতাব্দীর গৌরব পুর্ণ হয় সরকার নিয়ন্ত্রিত দিনাজপুর পৌরসভারও। প্রাথমিক পর্যায়ে যখন অত্র শহরটির গড়ন শুরু হয় তখন এটা ছিল একটি গ্রামগঞ্জের মত শহর। আকার আয়তনে যেমনি ছোট ছিল তেমনি অধিবাসী ছিল মুষ্টিমেয়। অনুপাতে ঘরবাড়ীর সংখ্যা ছিল আরো কম। তারমধ্যে পাকা দালান-কোঠার তুলনায় অধিকাংশ ঘরবাড়ী ছিল কাঁচা, আধপাকা অথবা কৃঁড়েঘর। অফিস আদালত ছিল মুষ্টিমেয় এবং অনেক সরকারী অফিসও ছিল কাঁচাঘর, মেটোঘর, খেড়োঘর ইত্যাদি। এমনকি পাকা ঘরের অভাবে তৎকালের অনেক শেতাঙ্গ অফিসারও খেড়োঘরে বাস করতেন।

বর্তমান দিনাজপুর

বর্তমান দিনাজপুর জেলা অস্তিত্বে আসে পুরাতন সেই দিনাজপুরের দুইদফা বিভাজনের মাধ্যমে। ১ম দফা বিভাজনটি সংঘটিত হয় ১৯৪৭ সালে বঙ্গভঙ্গের সময়- বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান) ও ভারতের মধ্যে এবং দিনাজপুরের কেন্দ্র তথা মূল অঞ্চলটি বাংলাদেশে পড়ে। ভারতের অংশটি (পশ্চিম দিনাজপুর) আবার ভেঙ্গে উত্তর দিনাজপুরদক্ষিণ দিনাজপুরগঠিত হয়। আর বাংলাদেশের অংশটি (বৃহত্তর দিনাজপুর জেলা) ১৯৮৪ সালে ভেঙ্গে দিনাজপুর (বর্তমান), ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলা গঠন করা হয় এবং বৃহত্তর দিনাজপুরের কিয়াদাংশ রংপুর ও নীলফামারী জেলার অন্তর্গত হয়।
এই ওয়েবসাইটটি বর্তমান দিনাজপুর জেলা নিয়ে।
উপরোক্ত ঘোড়াঘাট বর্তমানে ভারতের অংশ, ঘোড়াঘাট উপজেলা নয়।
ভারতবর্ষের কর্তৃত্ব পরবর্তীতে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী-র কাছ থেকে ব্রিটিশ সরকারের হাতে চলে যায়।

নতুন করে লিখতে হবে ঢাকার ইতিহাস

নতুন করে লিখতে হবে ঢাকার ইতিহাস

নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে অবস্থিত ন্যাশনাল আর্কাইভ।
ছবি: সংগৃহীত
সতেরো শতকের অজানা ঢাকা সম্পর্কে অজস্র তথ্য ছড়িয়ে আছে ওলন্দাজ বণিকদের ভ্রমণ বিবরণী, ডায়েরি, বার্ষিক প্রতিবেদন, লেজার বুকসহ নানান চিঠিপত্রে। নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে অবস্থিত জাতীয় মহাফেজখানায় সংরক্ষিত এসব নথির কারণে নতুন করে লিখতে হবে ঢাকার ইতিহাস। লিখেছেন আজিজুল ইসলাম

তথ্যের স্বল্পতার কারণে সতেরো শতকের ঢাকার ইতিহাস রচনা করতে ইতিহাসবিদদের বিশেষ সমস্যায় পড়তে হয়। এতকাল ঢাকার প্রথম শতকের ইতিহাসের জন্য নির্ভর করেতে হয়েছে গুটিকয়েক ফার্সি ক্রনিকল আর পর্যটকদের ভ্রমণ বিবরণের ওপর। দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসবিদেরা জানতেনই না, সতেরো শতকে ঢাকার জন্ম, পথচলা ও বেড়ে ওঠার কাহিনি জানতে আমাদের জন্য পসরা সাজিয়ে রেখেছে ওলন্দাজ মহাফেজখানা।
বহির্দেশে, বিশেষ করে এশিয়ায় সমুদ্রবাণিজ্য পরিচালনায় ওলন্দাজ রাজ্যের শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ার জন্য ১৬০২ সালে ওলন্দাজরা গঠন করেছিল ফেরেনেগিড উস্ট ইনডিসি কম্পাগনি বা ভিওসি, ইংরেজিতে যাকে আমরা ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামে চিনি।
রাজশাহীর পদ্মার তীরে অবস্থিত ওলন্দাজ কুঠি।
ছবি: মুহম্মদ লুৎফুল হক
কোম্পানি প্রতিষ্ঠার এক দশকের মধ্যেই পর্তুগিজদের হটিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ায় কোম্পানি তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। বাটাভিয়ায় (বর্তমানে জাকার্তা) কোম্পানির এশীয় বাণিজ্যের প্রধান ঘাঁটি স্থাপন করা হয়। ধীরে ধীরে কোম্পানি বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও পারস্যের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপন করে।
ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যবসায়ের প্রয়োজনে যেসব হিসাব, চিঠিপত্র, প্রতিবেদন তৈরি করত, তা প্রথমে বাটাভিয়ায় পাঠাত। সেখান থেকে সব নথিপত্র যেত ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হেডকোয়ার্টার্স আমস্টারডামে। সেখানে এই নথিগুলো সংরক্ষণ করা হতো। পরবর্তীকালে কোম্পানি যখন ভেঙে দেওয়া হয়, তখন এই নথিগুলো ডাচ এডুকেশন, কালচারাল অ্যান্ড সায়েন্স মিনিস্ট্রি নিয়ে নেয়। বর্তমানে এই নথিপত্রগুলো সংরক্ষিত আছে হেগ শহরে অবস্থিত জাতীয় মহাফেজখানায়।
ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় কারখানা স্থাপন করে ১৬৩০-এর দশকে। তবে ঢাকায় ওলন্দাজরা কারখানা প্রতিষ্ঠা করে আরও অনেক বছর পর। একটি চিঠিতে একজন ওলন্দাজ কোম্পানি কর্মকর্তা তাঁর ওপরস্থ কর্মকর্তাকে তাঁদের ঢাকা অভিযানের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লিখেন যে তাঁরা ঢাকায় কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে ঢাকা সফরে গিয়েছিলেন। কিন্তু হুগলিতে কিছু মোগল অফিসারের সঙ্গে কোম্পানি কর্মকর্তাদের বচসা হওয়ায় ঢাকায় সফরকারী ওলন্দাজদের জাহাজ আটক করা হয় এবং তাঁদের নবাবের কয়েদখানায় পাঠানো হয়। অবশেষে দিল্লিতে উচ্চপদস্থ ওলন্দাজ কর্মকর্তারা মোগল সম্রাটকে দামি উপহারসামগ্রী দিলে তাঁরা মুক্তি পান। এই তিক্ত অভিজ্ঞতার প্রায় আরও কুড়ি বছর পর ওলন্দাজরা ঢাকায় কারখানা স্থাপন করে। ঢাকার রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সম্ভাবনার এ রকম বিভিন্ন আলোচনা-পর্যালোচনা পাওয়া যায় তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদন ও চিঠিপত্রে।
ঢাকা সম্পর্কে তথ্য যেসব নথিপত্রে পাওয়া যায়, এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলা অঞ্চলের কারখানা-প্রধানের বার্ষিক প্রতিবেদন, ওলন্দাজ ভাষায় যাকে বলা হয় মেমোরি ওভারখাফে। এ ছাড়া ১৬৫০ সালের পর থেকে ওলন্দাজদের ঢাকা কারখানা-প্রধানের চিঠি, হিসাবপত্র ও প্রতিবেদন থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায়। এসব চিঠিপত্রে ঘুরেফিরেই কেরানীগঞ্জ, ময়মনসিংহ, রংপুর ও শেরপুরের নাম আসত। ঢাকা সম্পর্কে জানার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নথি হলো ওলন্দাজ কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ডায়েরি। প্রায় প্রত্যেক ওলন্দাজ কর্মচারী-কর্মকর্তা তাঁদের নিজস্ব ডায়েরি রাখতেন। এ রকম বেশ কিছু ডায়েরি সংরক্ষিত আছে ওলন্দাজ আর্কাইভসে। এসব ডায়েরির নাম ডাক্কা ডাখবুক বা ঢাকা ডায়েরি। সতেরো শতকের ঢাকার সামাজিক ইতিহাস রচনার জন্য এসব ডায়েরির মূল্য অপরিসীম।
আরেক ধরনের মূল্যবান ওলন্দাজ নথি দাখ রেখিস্টার বা লগ বুক এবং ভৌগোলিক বিবরণ। জাহাজের নাবিক এবং ক্রুরা প্রতিদিনের ঘটনা লিপিবদ্ধ করতেন এ রকম খাতায়। পূর্ববঙ্গ থেকে কোনো জাহাজ যখন মাল বোঝাই করে হুগলি এবং বাংলার আরও কোনো অঞ্চলে যেত, তখন বেশির ভাগ সময়ই এসব লগ বুকে তাঁরা পূর্ববঙ্গ সম্পর্কে পাওয়া বিবরণ দেন।
সতেরো শতকে আরাকানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল ওলন্দাজদের। আরাকানিদের প্রধান ব্যবসা ছিল বাংলা থেকে নারী-পুরুষ জোর করে তুলে নিয়ে দাস হিসেবে ওলন্দাজদের কাছে বিক্রি করা। আরাকানিদের সঙ্গে ব্যবসা এবং ঢাকায় তাদের বাণিজ্য-সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার জন্য বিভিন্ন সময়ে তারা এ অঞ্চলে যাতায়াত করত। তখনকার বিবরণ তারা নোটবুকে টুকে রাখত। কিন্তু সেসবের বেশির ভাগই ইংরেজিতে অনূদিত না হওয়ায় আমরা এর হদিসই জানতাম না। উদাহরণ হিসেবে একটি ওলন্দাজ পর্যটকের ভ্রমণ বিবরণের কথা উল্লেখ করা যায়। ফান দের হেইডেন নামে একজন ওলন্দাজ কোম্পানি কর্মচারী ইন্দোনেশিয়ার বাটাভিয়া থেকে হুগলির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। পথিমধ্যে ঝড়ের কবলে পড়ে তাঁদের জাহাজ ডুবে যায়। ফান দের হেইডেন এবং তার প্রায় ৩০ জন সঙ্গী ছোট্ট একটি ডিঙিতে করে তীরে উঠতে সক্ষম হন। সেখানে গাছের পাতা ও অখাদ্য খেয়ে অর্ধাহারে সপ্তাহ খানেক পার করেন তাঁরা। এরপর বহু কষ্টে তাঁরা সন্দ্বীপ নামে বর্তমান বাংলাদেশের উপকূলীয় দ্বীপে পৌঁছান। সেখানে তাঁরা গ্রাম্য মোড়লের আতিথেয়তা পান। তাদের উৎকৃষ্ট মানের চালের ভাত এবং আরও অনেক রসনাময় খাবার দিয়ে আপ্যায়িত করা হয়। ফান দের হেইডেন তাঁর ভ্রমণ বিবরণীতে গ্রামের সমাজ, অর্থনীতি ও নারীদের অবস্থার বিবরণ দেন। তিনি তাঁর বিবরণীতে উল্লেখ করেন চাল, মাছ, মুরগি, কলা এবং বিভিন্ন ধরনের মাংস এখানে প্রায় পানির দামে পাওয়া যায়। আর এ এলাকার মানুষকে তিনি খুবই অতিথিপরায়ণ বলে বর্ণনা করেন। সন্দ্বীপে কয়েক দিন অবস্থান করার পর তিনি এবং তাঁর সঙ্গীরা ভুলুয়া হয়ে ঢাকায় ওলন্দাজ কারখানায় আসেন। ভুলুয়া সম্পর্কেও তাঁর লেখায় তথ্য রয়েছে। সেখানকার মোগল আঞ্চলিক প্রশাসকের প্রাসাদকে তিনি জমকালো হিসেবে উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য, সতেরো শতকের প্রথম ভাগে ঢাকায় প্রাদেশিক রাজধানী স্থাপনের পর ভুলুয়ায় মোগলরা থানা প্রতিষ্ঠা করেন এবং কিছু সেনাসহ একজন থানাদার নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমান বৃহত্তর নোয়াখালী জেলা একসময় ভুলুয়া নামে পরিচিত ছিল। ঢাকায় দু-এক দিন থেকে ফান দের হেইডেন এবং তাঁর সঙ্গীদের হুগলি যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাংলার সুবাদার মীর জুমলা তখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আসাম অভিযানের। তিনি ভুক্তভোগী ওলন্দাজদের হুগলি না যেতে দিয়ে তাঁর সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করে। বাংলার সুবাদারের সেনাদলে থাকার কারণে তিনি মীর জুমলার আসাম অভিযান, মোগল ফিল্ড আর্মি এবং যুদ্ধরীতি সম্পর্কে প্রভূত অভিজ্ঞতা লাভ করেন। এসব অভিজ্ঞতাই পাওয়া যায় ফান দের হেইডেনের ভ্রমণ বিবরণীতে।
শুধু ফান দের হেইডেনের ভ্রমণ বিবরণীই নয়, এই মহাফেজখানায় রক্ষিত আছে আরও অনেক ভ্রমণ বিবরণী, ঢাকা ডায়েরি, কোম্পানির, বার্ষিক প্রতিবেদন, লেজার বুক, মানচিত্র এবং চিঠিপত্রে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ঢাকা এবং পূর্ববঙ্গ সম্পর্কে অনেক বিচিত্র এবং প্রয়োজনীয় তথ্য। এর সবই সতেরো শতকের পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশ এবং ঢাকার ইতিহাস পুনর্গঠনে ঠিক সোনার খনির মতোই।
(দৈনিক প্রথম আলো:
| তারিখ: ২৬-০৪-২০১৩)