এহসানুল হক জসীম :
সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, বিশিষ্ট আলেম, শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক প্রিন্সিপাল মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী আর আমাদের মাঝে নেই (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
শনিবার (১৩ জুন) রাত ১টা ৩০ মিনিটে সিলেট নগরীর ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
তাঁর মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং কানাইঘাট-জকিগঞ্জ তথা সমগ্র সিলেট অঞ্চলের একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান ঘটল। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর পরিচয় একজন রাজনীতিবিদ বা সংসদ সদস্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে শিক্ষা, সমাজসেবা, ধর্মীয় নেতৃত্ব ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিস্তৃত ছিল।
তালবাড়ী থেকে নেতৃত্বের শিখরে
কানাইঘাট উপজেলার তালবাড়ী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী। তাঁর পিতা মাওলানা আবদুল হক চৌধুরী ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। শৈশব থেকেই ধর্মীয় ও নৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল সম্পন্ন করে তিনি এমসি কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বিত ধারা তাঁর ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বকে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতা।
ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখ
ষাট ও সত্তরের দশকে তিনি সিলেট অঞ্চলের ছাত্ররাজনীতির অন্যতম পরিচিত মুখ ছিলেন। ইসলামী ছাত্রসংঘের জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করে তিনি নেতৃত্বের যে দক্ষতা দেখিয়েছিলেন, পরবর্তীতে তা জাতীয় রাজনীতিতেও প্রতিফলিত হয়।জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, সাংগঠনিক সম্পাদক ও অঞ্চল পরিচালকের দায়িত্বসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে তিনি দীর্ঘদিন রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি আদর্শ ও জনকল্যাণের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
সংসদ সদস্য হিসেবে এক স্বর্ণযুগ
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৫ আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়কে অনেকেই সিলেট-৫ আসনের উন্নয়নের স্বর্ণযুগ হিসেবে উল্লেখ করেন। দীর্ঘদিনের অবহেলিত কানাইঘাট ও জকিগঞ্জে এ সময় যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক পরিবর্তন আসে।
উন্নয়নের স্থপতি
একসময় কানাইঘাট ছিল যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত দিক থেকে পিছিয়ে থাকা একটি জনপদ। কাঁচা রাস্তা, বিদ্যুতের অভাব এবং বিচ্ছিন্ন জনজীবন ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা।
সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি এই চিত্র বদলে দিতে নিরলসভাবে কাজ করেন।
তাঁর সময়েই ঐতিহাসিক বোরহানউদ্দিন সড়ক আধুনিক রূপ পায়। অসংখ্য গ্রামীণ সড়ক পাকাকরণ, ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণের মাধ্যমে বদলে যায় জনপদের যোগাযোগ ব্যবস্থা। সুরইঘাট অঞ্চলের যোগাযোগ উন্নয়ন এবং জকিগঞ্জের বিভিন্ন সড়ক নির্মাণেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বিদ্যুতায়নেও তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। তাঁর সময়েই কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুতের আলো পৌঁছে যায়, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আনে।
শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া এক মহানায়ক
রাজনীতির বাইরেও তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল একজন শিক্ষানুরাগী হিসেবে।তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা ছাড়া কোনো সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন।
মিরাবাজার শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুল, পাঠানটুলা শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা, আল-আমীন জামেয়া উচ্চ বিদ্যালয়, জালালাবাদ ইন্টারন্যাশনাল আলিম মাদ্রাসা এবং জালালাবাদ কলেজসহ বহু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নিজ গ্রাম তালবাড়ীতেও তিনি ব্যক্তিগত জমি দান করে একটি বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, যা আজও তাঁর দূরদর্শী চিন্তার সাক্ষ্য বহন করছে।
কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা
শিক্ষা ও রাজনীতির পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন সফল উদ্যোক্তাও। সিলেটের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আল-হামরা শপিং সিটির প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তাদের একজন হিসেবে তিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে শত শত মানুষের জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
প্রাজ্ঞ আলেম ও মুফাসসির
মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন উচ্চমানের একজন আলেম ও মুফাসসিরে কুরআন। তাঁর তাফসির ও বয়ানে ছিল জ্ঞানের গভীরতা, প্রজ্ঞা ও সহজ উপস্থাপনা। তিনি কখনো আবেগনির্ভর জনপ্রিয়তার পথ বেছে নেননি; বরং যুক্তি, জ্ঞান ও কুরআনের আলোকে মানুষকে পথ দেখিয়েছেন। তাঁর বয়ান শুনে উপকৃত হয়েছেন হাজারো মানুষ।
সততা ও সৌজন্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক
রাজনীতিতে দীর্ঘ পথচলা সত্ত্বেও তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ ছিল না। ক্ষমতার দম্ভ নয়, বিনয় ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়। দল-মত নির্বিশেষে সকলের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতেন তিনি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও তাঁর সততা, শালীনতা ও ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করতেন।সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দ ব্যবস্থাপনায়ও তিনি ছিলেন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
কিছু স্মৃতি, কিছু অনুভব
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল ও মানবিক। মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থাকা, অসুস্থদের দেখতে যাওয়া কিংবা জানাজায় শরিক হওয়া ছিল তাঁর স্বভাবের অংশ। অনেকের মতো লেখকের জীবনেও তিনি রেখে গেছেন অমলিন স্মৃতি। একজন অভিভাবকের মতো তিনি তরুণদের উৎসাহ দিতেন, খোঁজখবর নিতেন এবং সম্ভাবনাময় মানুষদের এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করতেন।
জনপদের হৃদয়ে চিরজাগরুক
মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যু একটি যুগের অবসান। তবে তাঁর কর্ম, সততা, উন্নয়ন ভাবনা, শিক্ষাবিস্তার এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে মৃত্যুর পরও জীবন্ত রাখবে। কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের অসংখ্য রাস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সেতু, বিদ্যুতের আলো এবং মানুষের স্মৃতিতে তিনি বেঁচে থাকবেন দীর্ঘকাল।
জনপদের এই রূপকার বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আলোকিত পথচিহ্ন আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাবে বহু বছর ধরে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমিন।

0 comments:
পাঠকের মতামতের জন্য কানাইঘাট নিউজ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়