নিজস্ব প্রতিবেদক:
সিলেটের কানাইঘাটে কিস্তিতে ফ্রিজ কেনা, কিস্তির টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে ওয়ালটন প্লাজার কর্মকর্তাদের সঙ্গে এনসিপি নেতা বোরহান উদ্দিন ইউসুফের বিরোধ এবং পরবর্তীতে আদালতে মামলা দায়েরের ঘটনায় এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কানাইঘাটের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গণেও চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
জানা যায়, সিলেট জেলা এনসিপির আহ্বায়ক কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক বোরহান উদ্দিন ইউসুফ প্রায় এক বছর ধরে কানাইঘাট পৌরসভার মহেষপুর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি উপজেলার লক্ষীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের সাউদগ্রামে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ৯ জুন। ওইদিন বড়চতুল ইউনিয়নের মুক্তাপুর গ্রামের মন্তাজ আলীর ছেলে শামীম আহমদ কানাইঘাট বাজারের ওয়ালটন প্লাজায় ফ্রিজ কিনতে যান। সেখানে তাঁর পূর্বপরিচিত বোরহান উদ্দিন ইউসুফের সঙ্গে দেখা হয়। কথোপকথনের একপর্যায়ে শামীম আহমদ জানান, তিনি নগদ টাকায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার মধ্যে একটি ফ্রিজ কিনতে চান। এ সময় বোরহান উদ্দিন ইউসুফ তাঁকে জানান, ওয়ালটন প্লাজার কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক রয়েছে এবং তিনি ফ্রিজ কিনে দিলে ভালো মানের ফ্রিজ পাওয়া যাবে। একপর্যায়ে শামীমকে প্লাজার সামনে অপেক্ষা করতে বলে বোরহান নিজে ভেতরে প্রবেশ করেন।
পরে বোরহান উদ্দিন ইউসুফ মাসিক ৪ হাজার ৩১০ টাকা করে ছয় মাসের কিস্তিতে মোট ৩২ হাজার ৮৫০ টাকা মূল্যের একটি ফ্রিজ নিজের নামে ক্রয় করেন। এ সময় তিনি ৭ হাজার টাকা নগদ জমা দেন। এরপর শামীম আহমদের কাছ থেকে ফ্রিজের সম্পূর্ণ মূল্য গ্রহণ করে তাঁরা ফ্রিজটি নিয়ে বাড়িতে চলে যান বলে অভিযোগ করেন শামীম আহমদ।
কানাইঘাট ওয়ালটন প্লাজার ব্যবস্থাপক সোহাগ হোসেন জানান, বোরহান উদ্দিন ইউসুফের নামে ফ্রিজটি কিস্তিতে বিক্রি করা হয়েছিল। জুলাই মাসের ৪ হাজার ৩১০ টাকা কিস্তির মধ্যে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে তাঁর কাছ থেকে মাত্র ১ হাজার টাকা আদায় করা সম্ভব হয়। বাকি ৩ হাজার ৩১০ টাকা এবং আগস্ট মাসের সম্পূর্ণ কিস্তি আদায়ের জন্যও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু কোনোভাবেই কিস্তির টাকা আদায় করা সম্ভব হচ্ছিল না।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৪ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে কিস্তির টাকা আদায়ের জন্য ওয়ালটন প্লাজার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বোরহান উদ্দিন ইউসুফের বাসায় যান। ওয়ালটন কর্তৃপক্ষের দাবি, সেখানে কথাবার্তার একপর্যায়ে বোরহান তাঁদের বাসার ভেতরে রেখে বিষয়টি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং দরজা বন্ধ করার চেষ্টা করেন। পরে কর্মকর্তারা ভেতর থেকে দরজা খুলে বের হওয়ার সময় দরজায় ধাক্কা লেগে বোরহানের কপালে আঘাত লাগে। তবে বোরহান উদ্দিন ইউসুফের দাবি, তাঁকে মারধর করে আহত করা হয়েছে।
ঘটনার পর বিষয়টি শান্তিপূর্ণভাবে মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওইদিন রাতে কানাইঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামের কার্যালয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, এনসিপির নেতাকর্মী এবং ওয়ালটনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা ফয়ছল আহমদ, সদর ইউপি বিএনপির সভাপতি নিজাম উদ্দিন মেম্বার, উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব রাসেল চৌধুরীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, সেপ্টেম্বর মাসের ১০ তারিখের মধ্যে বোরহান উদ্দিন ইউসুফ ওয়ালটনের ফ্রিজের তিনটি কিস্তির টাকা পরিশোধ করবেন এবং তাঁর আহত হওয়ার ঘটনায় চিকিৎসা ব্যয় ওয়ালটন কর্তৃপক্ষ বহন করবে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই সিদ্ধান্তে বোরহান উদ্দিন ইউসুফ সন্তুষ্ট হন। এমনকি বৈঠক শেষে ওয়ালটনের কর্মকর্তাদের মিষ্টিমুখ করান এবং বিষয়টি ভুল বোঝাবুঝির মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল বলে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে ব্রিফিং করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি বিষয়টি নিয়ে পোস্ট করেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
তবে মীমাংসার কয়েকদিন পরই ঘটনাটি নতুন মোড় নেয়। গত ৩১ আগস্ট এনসিপি নেতা বোরহান উদ্দিন ইউসুফ সিলেটের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী ৫ নম্বর আদালতে বাদী হয়ে কানাইঘাট বাজারের ওয়ালটন প্লাজার ছয়জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলায় তাঁদের বিরুদ্ধে তাঁকে মারধর করে গুরুতর আহত করা, ডাকাতির উদ্দেশ্যে তাঁর বাসায় প্রবেশ এবং তাঁর স্ত্রীর স্বর্ণালংকার লুটসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলা দায়েরের পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে কানাইঘাটের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গণে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে ওয়ালটন কর্তৃপক্ষের দাবি, কিস্তির টাকা আদায় করতে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল এবং বিষয়টি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে মীমাংসা করা হয়েছিল। অন্যদিকে বোরহান উদ্দিন ইউসুফের অভিযোগ, তাঁকে আহত করা হয়েছে এবং তাঁর স্ত্রীর স্বর্ণালংকার লুট করা হয়েছে। এসব অভিযোগের যথাযথ প্রতিকার না পাওয়ায় তিনি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।
কানাইঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, এনসিপি নেতা বোরহান উদ্দিন ইউসুফের সঙ্গে ওয়ালটন কর্মকর্তাদের সৃষ্ট ঘটনাটি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে থানায় বসে সুন্দরভাবে মীমাংসা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে বোরহান আদালতে মামলা দায়ের করায় আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী মামলাটি থানায় রেকর্ড করা হয়েছে।
উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা ফয়ছল আহমদ বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে বোরহান উদ্দিন ইউসুফের সঙ্গে ওয়ালটন কর্মকর্তাদের যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছিল, তা থানায় বসে বোরহান উদ্দিন ইউসুফের বক্তব্য ও সম্মতির ভিত্তিতেই শান্তিপূর্ণভাবে মীমাংসা করা হয়েছিল। এখন তিনি ওয়ালটন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যে মামলা করেছেন, তা নিয়ে কানাইঘাটের মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে ফ্রিজ কেনার ঘটনায় শামীম আহমদ দাবি করেন, তিনি নগদ টাকা দিয়ে ফ্রিজ কিনতে ওয়ালটন প্লাজায় গিয়েছিলেন। কিন্তু বোরহান উদ্দিন ইউসুফ তাঁর কাছ থেকে সম্পূর্ণ টাকা নিয়ে নিজের নামে ফ্রিজটি কিস্তিতে ক্রয় করেন। ঘটনার পর থেকে তিনি ফ্রিজটির কোনো কাগজপত্র বা প্রয়োজনীয় প্রমাণাদি পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ করেন শামীম। এতে তিনি চরম বিপাকে পড়েছেন বলে জানান।
অন্যদিকে এনসিপি নেতা বোরহান উদ্দিন ইউসুফ বলেন, তাঁকে আহত করা এবং তাঁর স্ত্রীর স্বর্ণালংকার লুটের অভিযোগসহ তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার যথাযথ প্রতিকার হয়নি। থানায় যেভাবে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়েছিল, তাতে তিনি ও তাঁর দলের নেতাকর্মীরা সন্তুষ্ট নন। আহত হওয়ার ঘটনা এবং স্বর্ণালংকার লুটের ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় জেলা এনসিপির নেতাদের নির্দেশে তিনি আদালতে মামলা দায়ের করেছেন বলে জানান।
এ ঘটনায় কিস্তিতে ফ্রিজ কেনা, অর্থ লেনদেন, কিস্তির টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে বিরোধ, আহত হওয়ার অভিযোগ, থানায় মীমাংসা এবং পরবর্তীতে আদালতে মামলা—সব মিলিয়ে কানাইঘাটজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে মামলায় করা অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্ত ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।

0 comments:
পাঠকের মতামতের জন্য কানাইঘাট নিউজ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়