রমজানের ২৭ দিনেই সম্পন্ন করেন পবিত্র কোরআনের হিফজ; পরে আলিম পরীক্ষায় বোর্ডসেরা হয়ে দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় দ্বীনি শিক্ষার খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন।
সেলিম আউয়াল:
মাত্র সাতাশ দিনে পুরো কোরআন শরীফ মুখস্থ করে ফেললেন তিনি। তখন তাঁর বয়স চৌদ্দ বছর, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম পরীক্ষা দিয়ে সমগ্র বোর্ডে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। মেধাবী এই মানুষ হচ্ছেন বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গাছবাড়ি জামিউল উলুম কামিল মাদ্রাসার সাবেক প্রিন্সিপাল হাফিজ মাওলানা আব্দুর রহীম।
মাত্র সাতাশ দিনে পবিত্র কোরআন হিফজ করার প্রসঙ্গ তুললে মাওলানা আব্দুর রহীম বলেন, এটি আল্লাহর মেহেরবানী। সিলেট নগরীর কুদরত উল্লাহ জামে মসজিদের দোতলায় বসে কথা হচ্ছিলো পবিত্র রমজানের যোহরের নামাজের পর। পাশে বসা তাঁর ছাত্র বিশিষ্ট পুস্তক ব্যবসায়ী মাওলানা খলিলুর রহমান, হাফেজ মাওলানা মিফতাহুল ইসলাম, মাসিক ভিন্নধারা সম্পাদক জাহেদুর রহমান চৌধুরী ও ক্বারী আব্দুল বাসিত মিলন।
ব্যক্তিগত জীবনে নিরহংকারী বিনয়ী মাওলানা আব্দুর রহীম আমাদের অনুরোধে তাঁর কোরআন হিফজের বিস্তারিত তুলে ধরলেন-সে বছরটিতে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম পরীক্ষায় সেদিনের পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে তিনি প্রথম হয়েছেন। রমজানের ছুটির জন্যে বাড়িতে চলে যান। বাড়িতে বসে জানতে পারেন তাদের দু‘বছরের সিনিয়র মাওলানা আবু সাঈদ (লন্ডনে বাস করছেন অনেক দিন থেকে) এক রমজান মাসে কোরআন হিফজ করে ফেলেছেন। মাত্র এক মাসে কোরআন হিফজ করার বিষয়টি মাওলানা আব্দুর রহীমকে বিস্মিত করে। তিনি বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন তাঁর বন্ধু ও সহপাঠি পাশের ইউনিয়নের তিনচটি গ্রামের মাওলানা আলা উদ্দিনের সাথে। এতো কম সময়ে কোরআন হিফজ করার বিষয়টি তাঁদেরকে বিস্মিত করে।
প্রতিদিন এক পারা কোরআন শরীফ মুখস্ত করে পাশের বাড়ির একজন হাফিজ সাহেবের কাছে শুনাতেন। সবই চলছিলো কাউকে কিছুই না জানিয়ে। মাত্র সাতাশ দিন পর বাবা মাওলানা আব্দুল ওয়াহাব-সহ এলাকাবাসী বিস্ময়ের সাথে জানলেন আব্দুর রহীম পবিত্র কোরআন হিফজ সম্পন্ন করেছেন। এদিকে তাঁর বন্ধু মাওলানা আলাউদ্দিনও তাঁর মতো কাউকে না জানিয়ে তিনিও হিফজ সম্পন্ন করেছেন। দু‘বন্ধু দু‘বন্ধুকে চমকে দিয়ে জানালেন মাত্র সাতাশ দিনে কোরআন হিফজ করার কথা। মাওলানা আলাউদ্দিন পরবর্তীতে যুক্তরাজ্য প্রবাসী হয়ে যান এবং সেখানেই ইন্তেকাল করেন। যুক্তরাজ্যে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
হাফিজ মাওলানা আব্দুর রহীম ১৯৫২ সালের পহেলা মার্চ সিলেট জেলার কানাইঘাট উপজেলার ৭ নং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের সরদারীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা বিশিষ্ট আলেম মাওলানা আব্দুল ওয়াহাব এবং মাতা কুলসুমা বেগম। গ্রামের মক্তবেই তাঁর পড়ালেখা শুরু হয়। এরপর উমরগঞ্জ প্রাইমারী স্কুলে প্রাইমারী শিক্ষা শেষ করেন। পরবর্তীতে উমরগঞ্জ ইমদাদুল উলুম মাদ্রাসায় মক্তবে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এই মাদ্রাসায় পাঁচ বছর পড়াশোনা সেরে তিনি গাছবাড়ী জামিউল উলূম কামিল মাদ্রাসায় ভর্তি হন। এই মাদ্রাসা থেকে সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তান মাদ্রাসা এডুকেশন বোর্ড ঢাকা-এর অধীনে ১৯৬২ সালে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রথম বিভাগে পাশ করেন। ১৯৬৬সালে আলিম পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মাদ্রাসা বোর্ডে প্রথম স্থান অর্জন করেন এবং একই বছর মাত্র সাতাইশ দিনে পবিত্র কোরআন হিফজ করেন। ১৯৬৮ সালে ফাজিল পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে তৃতীয় স্থান লাভ করেন। ১৯৭০ সালে একই মাদ্রাসা থেকে মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে কামিল (হাদিস) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন।
১৯৭০ সালে কামিল পরীক্ষার পর পরই এতিহ্যবাহী ঝিঙ্গাবাড়ি ফাজিল মাদ্রাসায় সেই সময়ের সুপার মাওলানা হাফিজ আব্দুল আজিজ তাঁর দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাওলানা আব্দুর রহীমকে নিয়োগ দেন। দেড় বছর সুনামের সাথে দায়িত্ব পালনের পর শ্রদ্ধেয় পিতার বার্ধক্য জনিত অসুস্থতার কারনে চাকুরী হতে অব্যাহতি নিয়ে বাড়ি চলে আসেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় এবং সেই পাকা রাস্তা না থাকায় সর্দারীপাড়া গ্রাম থেকে ঝিংগাবাড়ীতে যাতায়াত একটু সময়ের ব্যাপার ছিলো। ফলে ঝিংগাবাড়ীতে দায়িত্ব পালন করে পিতার খেদমত করাও কঠিন ছিলো। যাহোক, ২৩ জুন ১৯৭৩ সালে পিতার ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত তিনি বাড়িতে ছিলেন। এই সময় স্থানীয় বড়দেশ মাদ্রাসার মুহতামীম ও এলাকাবাসীর অনুরোধে উক্ত মাদ্রাসায় হিফযুল কোরআন-সহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দান করে ছাত্র শিক্ষকদের প্রশংসা অর্জন করেন।
মাওলানা আব্দুর রহীম ১৯৭৩ সালে ২৩ জুলাই গাছবাড়ী জামিউল উলূম কামিল মাদ্রাসায় সিনিয়র মাওলানা পদে যোগদান করেন। ১৯৮১ থেকে তিরমিযী শরীফ এবং ১৯৮৩ থেকে বুখারী শরিফের খেদমতে তাঁকে নিয়োজিত করা হয়। ১৯৮৬ সালে মুহাদ্দিস এবং ১৯৮৭ সালে তাঁকে সর্ব সম্মতিক্রমে উপাধ্যক্ষ পদের জন্য নির্বাচিত করা হয়। উপাধ্যক্ষের পাশাপাশি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
দায়িত্বে দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৪ সালে তাঁকে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ মাদরাসা শিক্ষক নির্বাচন করা হয়। দীর্ঘ ১২ বছর অত্যন্ত সুনামের সাথে উপাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনের পর ১৯৯৯ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে গাছবাড়ী জামিউল ঊলূম কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৩ বছর ২ মাস অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালনের পর ২০১২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি তাঁর বয়স ৬০ বছর পূর্তিতে তিনি দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করেন। মাদরাসা পরিচালনা কমিটি ও এলাকাবাসী তাঁকে কোনভাবেই স্থায়ী বিদায় না দিয়ে পুণরায় অতিরিক্ত মুহাদ্দিস হিসাবে নিয়োগ দানের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি এ সিন্ধান্তকে সম্মানের সাথে গ্রহণ করে ২০১২ সালের ২৪ মার্চ থেকে অতিরিক্ত মুহাদ্দিস হিসেবে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৮ সালে বাবা-মা একমাত্র ছেলের বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কানাইঘাট উপজেলার ঝিঙ্গাবাড়ীর প্রখ্যাত আলেম, পীরে কামিল শেখ হযরত মাওলানা নিছার আলীর তৃতীয় কন্যা আবিদা বেগমের সাথে ১৯৬৮ সালের জানুযায়ি মাসে মাওলানা আব্দুর রহীমের বিয়ে সম্পন্ন হয়। মাওলানা আব্দুর রহীম ৬ সন্তানের জনক। তিন ছেলের এবং তিন মেয়ের প্রত্যেকেই মাদরাসা শিক্ষিত এবং বিবাহিত। ছোট মেয়ে কুরআনে হাফিজ ও দাওয়ায়ে হাদীস পাস। দুই ছেলে কুরআনে হাফেজ। বর্তমানে মাওলানা আব্দুর রহীম আমেরিকায় থাকেন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গল্পকার


0 comments:
পাঠকের মতামতের জন্য কানাইঘাট নিউজ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়