Monday, June 8

কানাইঘাটের তেলক্ষেত্র: ৪৪ বছর পর ফিরে আসা এক সম্ভাবনার ইতিহাস


এহসানুল হক জসীম :

বাংলাদেশের জ্বালানি সম্পদের ইতিহাসে সিলেট অঞ্চল বরাবরই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। দেশের বৃহৎ গ্যাসক্ষেত্রগুলোর অধিকাংশই এ অঞ্চলে অবস্থিত। তবে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বড়চাতল এলাকায় অবস্থিত একটি পুরোনো তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান কূপ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় পর্যায়ে নানা আলোচনা, কৌতূহল ও জনশ্রুতি প্রচলিত ছিল। বহু মানুষের বিশ্বাস ছিল, এ অঞ্চলের মাটির নিচে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল ও গ্যাসের মজুত রয়েছে, যদিও সেই সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন কোনো দৃশ্যমান সরকারি আলোচনা ছিল না।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে উত্থাপিত এক প্রশ্নের জবাবে বড়চাতল এলাকার ঐতিহাসিক ‘আটগ্রাম-১’ অনুসন্ধান কূপ সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য সামনে আসায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। এর মাধ্যমে চার দশকেরও বেশি সময় আগে পরিচালিত একটি অনুসন্ধান কার্যক্রমের ইতিহাস, ফলাফল এবং বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সংসদে উত্থাপিত প্রশ্নে নতুন করে আলোচনায় বিষয়টি

জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান কানাইঘাট উপজেলার বড়চাতল এলাকায় অতীতে আবিষ্কৃত তেলক্ষেত্রের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চান।

তার প্রশ্নে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭৮ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে বড়চাতল এলাকায় একটি তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি এবং দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার প্রেক্ষাপটে ওই এলাকা থেকে পুনরায় তেল বা গ্যাস উত্তোলনের কোনো পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে কি না, সেটিও জানতে চাওয়া হয়। সংসদ সদস্যের এ প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় অতীতের অনুসন্ধান কার্যক্রম, পরীক্ষার ফলাফল এবং কূপটির বর্তমান অবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে। ফলে বহু বছর ধরে আলোচনার বাইরে থাকা বড়চাতলের তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের ইতিহাস আবারও জনসমক্ষে আসে।

আটগ্রাম-১: আশির দশকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জার্মান সরকারের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত ‘মাল্টিওয়েল ড্রিলিং প্রজেক্ট (এমডিপি)’-এর আওতায় বড়চাতল এলাকায় ‘আটগ্রাম-১’ নামে একটি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা ১৯৮১ সালের ২৫ জুন কূপটির খনন কাজ শুরু করে। প্রায় এক বছরব্যাপী কার্যক্রম শেষে ১৯৮২ সালের ১০ জুন খনন সম্পন্ন হয়। কূপটির চূড়ান্ত গভীরতা ছিল ১৬ হাজার ২৭৬ ফুট বা প্রায় ৪ হাজার ৯৬১ মিটার।

তৎকালীন সময়ে এটি ছিল দেশের অন্যতম গভীর অনুসন্ধান কূপ। খননকাজ চলাকালে ভূগর্ভস্থ স্তর বিশ্লেষণের মাধ্যমে ছয়টি সম্ভাবনাময় রিজার্ভার স্যান্ড জোন শনাক্ত করা হয় এবং এসব স্তরে পৃথকভাবে পরীক্ষা চালানো হয়।

সরকারি নথি অনুযায়ী, পরীক্ষার সময় বিভিন্ন স্তরে গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। একই সঙ্গে তরল পদার্থও পাওয়া যায়। পরীক্ষাকালীন সময়ে কূপ থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় ০.১৫৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এবং ১ হাজার ২৩৪ ব্যারেল তরল উপাদান বা পানি উৎপাদিত হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কেন বন্ধ হয়ে যায় অনুসন্ধান কার্যক্রম?

প্রাথমিক পরীক্ষায় গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেলেও পরবর্তী সময়ে কূপটির উৎপাদন সক্ষমতা প্রত্যাশিত মাত্রায় স্থায়ী হয়নি।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কিছু সময় পর কূপের ‘ফ্লোয়িং ওয়েলহেড প্রেসার’ বা স্বাভাবিক ভূগর্ভস্থ চাপ দ্রুত কমে যায়। এর ফলে গ্যাস ও তরল পদার্থের প্রবাহও হ্রাস পেতে থাকে। একপর্যায়ে প্রাকৃতিক প্রবাহ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। পেট্রোবাংলার তৎকালীন ‘ওয়েল কমপ্লিশন রিপোর্ট’-এ কূপটিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয় বলে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, তখনকার বাজার পরিস্থিতি, উৎপাদন ব্যয় এবং সম্ভাব্য মজুতের পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে কূপটি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হিসেবে বিবেচিত হয়নি। এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে ১৯৮২ সালের ১০ জুন ‘আটগ্রাম-১’ কূপকে ‘প্লাগড অ্যান্ড অ্যাবান্ডনড’ বা স্থায়ীভাবে বন্ধ ও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

স্থানীয় জনশ্রুতি ও ঐতিহাসিক স্মৃতি

বড়চাতল এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার বিষয়টি স্থানীয় মানুষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বিষয় ছিল। এলাকাবাসীর অনেকেই মনে করতেন, সেখানে তেল ও গ্যাসের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। এলাকার প্রবীণ বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনুসন্ধান কার্যক্রমের সময় এলাকায় বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল। কূপ এলাকায় যাতায়াতের সুবিধার্থে সড়ক উন্নয়ন এবং একটি হেলিপ্যাড নির্মাণের কথাও স্থানীয়রা উল্লেখ করেন।

যদিও এসব স্মৃতি স্থানীয় পর্যায়ে এখনও আলোচিত হয়, তবে কূপটি বন্ধ হওয়ার কারণ সম্পর্কে সরকারি ব্যাখ্যাই বর্তমানে একমাত্র আনুষ্ঠানিক নথিভুক্ত অবস্থান।

বর্তমান জ্বালানি বাস্তবতায় নতুন প্রশ্ন

বাংলাদেশ বর্তমানে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মোকাবিলায় দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন কমে আসা, আমদানি নির্ভরতা বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপের কারণে নতুন জ্বালানি উৎস অনুসন্ধানের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বড়চাতল এলাকার পুরোনো অনুসন্ধান কূপ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, চার দশক আগের প্রযুক্তি ও বর্তমান প্রযুক্তিগত সক্ষমতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।বর্তমানে ত্রিমাত্রিক (৩ডি) সিসমিক জরিপ, উন্নত রিজার্ভার মডেলিং, অনুভূমিক খনন (Horizontal Drilling) এবং আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির মাধ্যমে অতীতে অলাভজনক বিবেচিত কিছু ক্ষেত্রও পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে কোনো ক্ষেত্র পুনরায় উন্নয়নযোগ্য কি না, তা নির্ধারণের জন্য নতুন জরিপ, ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

পুনর্মূল্যায়নের দাবি

কানাইঘাটের বড়চাতল এলাকার বিষয়টি সংসদে আলোচনায় আসার পর স্থানীয় পর্যায়ে নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, আধুনিক প্রযুক্তির আলোকে এ অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন করা যেতে পারে। জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্ভাবনাময় পুরোনো অনুসন্ধান ক্ষেত্রগুলো পর্যায়ক্রমে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স) বা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তায় নতুন জরিপ পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। তবে পুনরায় অনুসন্ধান বা উন্নয়ন কার্যক্রম শুরুর আগে পর্যাপ্ত কারিগরি মূল্যায়ন এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অপরিহার্য বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

পরিশেষ

কানাইঘাটের বড়চাতল এলাকার ‘আটগ্রাম-১’ কূপ বাংলাদেশের জ্বালানি অনুসন্ধানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। চার দশকেরও বেশি সময় আগে পরিচালিত অনুসন্ধান কার্যক্রমে গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেলেও অর্থনৈতিক কারণে কূপটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বিষয়টি পুনরায় আলোচনায় আসায় পুরোনো এই অনুসন্ধান ক্ষেত্র নতুন করে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং জ্বালানি বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের সম্ভাবনা পুনর্মূল্যায়নের প্রশ্নও সামনে এসেছে।

বড়চাতলের ভূগর্ভে কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও গবেষণা, জরিপ ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, কানাইঘাটের এই অনুসন্ধান কূপ বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে এখনও প্রাসঙ্গিকতা ধরে রেখেছে।




শেয়ার করুন

0 comments:

পাঠকের মতামতের জন্য কানাইঘাট নিউজ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়