Sunday, June 7

হাসপাতালের শয্যায় জনপদের উন্নয়নপুরুষ, স্মরণে তাঁর অবদান

 

রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের এক মুরব্বীর সাথে এমপি থাকাকালীন সময়ে কুশল বিনিময় করছেন মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী

এহসানুল হক জসীম::

সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য প্রিন্সিপাল মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর জীবন, কর্ম ও অবদান এই অঞ্চল তথা সমগ্র সিলেটের মানুষের কাছে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি একাধারে একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ, দূরদর্শী শিক্ষাবিদ ও শিক্ষানুরাগী, অনন্য সমাজসংস্কারক ও উচ্চমাপের আলেমে দ্বীন। দীর্ঘকাল ধরে সিলেটের ইসলামী রাজনীতি ও জনকল্যাণমুখী কর্মকাণ্ডে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের অবহেলিত জনপদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সামগ্রিক উন্নয়নে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। সিলেটে মানসম্মত ও আধুনিক শিক্ষার প্রসারে তাঁর হাত ধরে যে বিপ্লব সাধিত হয়েছে, তা এককথায় অনস্বীকার্য। সেই মানুষটি আজ অনেক দিন থেকে হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছেন। 

জন্ম ও প্রাথমিক জীবন::

মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী কানাইঘাটের এক কীর্তিমান সন্তান। সম্প্রতি ইবনে সিনা হাসপাতালে তাঁকে দেখতে গিয়ে তাঁর সুযোগ্য সন্তান নাজমুস সাকিব চৌধুরীর সাথে আলাপকালে তাঁর ব্যক্তিজীবনের কিছু প্রসঙ্গ উঠে আসে। সাকিব জানায়, তাঁর বাবার বর্তমান বয়স ৮২ বছর। সেই হিসেবে সাবেক এই এমপির জন্ম ১৯৪৪ সালে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক কিছু রেকর্ড অনুযায়ী তাঁর জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর। ১৯৪৪ বা ১৯৪৭—কালের যে প্রহরেই হোক না কেন, সিলেট জেলার কানাইঘাট উপজেলার তালবাড়ী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাওলানা আবদুল হক চৌধুরী ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর মাতাও ছিলেন এক মহীয়সী নারী—যিনি ৭ নং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের ঘড়াইগ্রামের প্রখ্যাত আলেম সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার সাবেক ভাইস প্রিন্সিপাল মরহুম মাওলানা জিল্লুর রহমানের আপন বোন। শৈশব থেকেই প্রখর মেধার অধিকারী ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী এক গভীর ধর্মীয় ও নৈতিক আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন। তাঁর শিক্ষাজীবন গড়ে উঠেছিল ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার এক অপূর্ব সমন্বয়ে।

তিনি ঐতিহ্যবাহী সিলেট সরকারী আলিয়া মাদ্রাসার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও খ্যাতিমান কৃতি ছাত্র। এই প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি ১৯৫৯ সালে দাখিল, ১৯৬৩ সালে আলিম, ১৯৬৫ সালে ফাজিল এবং ১৯৬৭ সালে কৃতিত্বের সাথে কামিল পাস করেন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে তিনি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন এবং একই কলেজে বাংলা অনার্সেও অধ্যয়ন করেন। শিক্ষাজীবনের এক পর্যায়ে তিনি গাছবাড়ী জামিউল উলূম কামিল মাদ্রাসায় আলিম শ্রেণিতে এক বছর পড়াশোনা করেছিলেন, পরে অবশ্য পুনরায় সিলেট আলিয়া মাদ্রাসায় ফিরে যান। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষে নিজেকে সমাজসেবা ও দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে বিলিয়ে দেন। মূলত ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর ভেতর নেতৃত্ব ও সমাজভাবনার স্ফুরণ ঘটেছিল।

ষাট ও সত্তরের দশকে ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন সিলেট অঞ্চলের ছাত্ররাজনীতির অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তিনি তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসংঘের সিলেট জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। আশির দশকে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন এবং নিজের সততা, কর্মদক্ষতা ও বাগ্মিতার জোরে সাধারণ মানুষের চোখের মণি হয়ে ওঠেন। কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন; বিভিন্ন মেয়াদে দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং অঞ্চল পরিচালকের মতো গুরুদায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সাথে পালন করেন। অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নিজ সংগঠনের আদর্শ ও গণমানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সক্রিয় ছিলেন।

সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক নিয়ে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সম্মানজনক ভোট পান। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ব্যালটের লড়াইয়ে তিনি ভোটে বিজয়ী হন এবং রেডিও-টেলিভিশনের প্রাথমিক ফলাফলে তাঁর বিজয় ঘোষিতও হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, তৎকালীন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রতিপক্ষের নানামুখী কৌশলের কারণে একটি কেন্দ্রের স্থগিত ভোট পুনর্নির্বাচনের নামে তাঁর নিশ্চিত বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

অবশেষে, ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে তিনি সিলেট-৫ আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ থেকে ২০০৬—এই পাঁচ বছর ছিল সিলেট-৫ আসনের ইতিহাসের এক অবিসংবাদিত ‘স্বর্ণযুগ’। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হারিছ চৌধুরী এবং সংসদ সদস্য মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী—এই দুই ব্যক্তিত্ব নিজ নিজ অবস্থান থেকে সমন্বিতভাবে কাজ করায় দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-বঞ্চিত এই জনপদে এক অভূতপূর্ব উন্নয়ন জোয়ার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

এলাকার উন্নয়নে বৈপ্লবিক রূপান্তর:

২০০১ সালের পূর্বে সিলেট-৫ আসনের যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। বিশেষ করে কানাইঘাট উপজেলা ছিল প্রায় বিচ্ছিন্ন ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। সিলেট শহর থেকে কানাইঘাট যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ঐতিহাসিক ‘বোরহানউদ্দিন রাস্তা’ তখনো ছিল কাঁচা ও চলাচলের অযোগ্য। উপজেলার সিংহভাগ মানুষই বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। সে সময় একটি স্লোগান ছিল—“আর কোনো দাবি নাই, বিদ্যুৎসহ রাস্তা (বোরহানউদ্দিন) চাই।”

সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী এই অবহেলিত জনপদের চেহারা বদলে দিতে কোমর বেঁধে নামেন। যোগাযোগ ব্যবস্থায় তিনি যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন, তা এই অঞ্চলের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এই রকম করে আর কে কাজ করতে পারবেন এলাকার জন্য-- সেটা সময় বলে দেবে। তবে বিগত প্রায় চার মাস ধরে বর্তমান সংসদ সদস্য মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান যেভাবে জনকল্যাণে তৎপর রয়েছেন, তা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক; আশা করি তিনি তাঁর পুরো মেয়াদে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন। যাহোক, ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর উন্নয়ন ছিল এক দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিপ্রস্তর। তাঁর উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে:

যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে তিনি অনন্য ভূমিকা রাখেন। গ্রামীণ কাঁচা রাস্তাঘাট পাকাকরণ, কালভার্ট ও ব্রিজ নির্মাণের মাধ্যমে তিনি যাতায়াত ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটান। কানাইঘাটবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ‘বোরহানউদ্দিন রাস্তা’কে তিনিই প্রথম পিচঢালা পথে রূপান্তর করে গাড়ি চলাচলের উপযোগী করেন। সুরমা নদীর দুই পাড়ের মানুষের মেলবন্ধনের জন্য কানাইঘাট সুরমা সেতুর নির্মাণকাজ তাঁর সময়েই শুরু হয়। অবশ্য এই সেতু বাস্তবায়নে হারিছ চৌধুরীর অনস্বীকার্য অবদান রয়েছে। সোজাকথায়, হারিছ চৌধুরীর কারণে এই ব্রীজ হয়েছে। 

সুরইঘাট অঞ্চলের সংযোগ স্থাপনে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখেন সাবেক এই এমপি। কানাইঘাটের সাথে অত্যন্ত দুর্গম ও প্রতিকূল সুরইঘাট অঞ্চলের বর্তমান চমৎকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীরই দূরদর্শী পরিকল্পনার ফসল। এই রাস্তাটি নির্মাণের ক্ষেত্রে তিনি রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠেছিলেন। ওই অঞ্চলে তাঁর ভোটের হিসাব কেমন ছিল—তা কখনো তাঁর উন্নয়ন ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করেনি।

জকিগঞ্জের উন্নয়নেও বৈষম্যহীনভাবে ভূমিকা রাখেন। জকিগঞ্জের শেওলা রাস্তা পাকাকরণসহ কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের প্রতিটি প্রান্তে তাঁর ছোঁয়া আজও স্পষ্ট। স্থানীয়রা অকপটে স্বীকার করেন—তিনি মাত্র ৫ বছরে যে কাজ করেছেন, তা সাধারণ সময়ে ৩০ বছরেও সম্ভব হতো না। তাঁর বিদায়ের পর এবং বর্তমান এমপির দায়িত্ব নেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মাঝখানের দীর্ঘ ২০ বছর উন্নয়ন গতি থমকে থাকায় এলাকাটি যে পিছিয়ে পড়েছিল, তা আজ পূরণ করা বড় চ্যালেঞ্জ।

বিদ্যুতায়নে তাঁর ভূমিকা স্মরণীয়। গ্রামীণ জনপদে বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সময়েই কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছায়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল করে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

তিনি ক্ষমতার দাপট দেখাননি, বরং একজন বিনয়ী সেবকের মতো মানুষের দ্বারে দ্বারে ছুটে গেছেন। দুর্নীতিমুক্ত ও নিষ্কলঙ্ক রাজনৈতিক জীবনের তিনি এক উজ্জ্বল বাতিঘর।

শিক্ষাক্ষেত্রে অনবদ্য অবদান:

রাজনীতি ও সংসদীয় জীবনের বাইরে মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর জীবনের সবচেয়ে স্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী অবদান রয়েছে শিক্ষাক্ষেত্রে। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন, শিক্ষার আলো ছাড়া কোনো অনগ্রসর সমাজকে বদলে দেওয়া সম্ভব নয়। এই বিশ্বাস থেকে তিনি সিলেট শহর ও নিজ নির্বাচনী এলাকায় অসংখ্য মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

কর্মজীবনের শুরুতে তিনি সিলেট নগরীর ঐতিহ্যবাহী মিরাবাজার শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুলের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রতিষ্ঠানটির মজবুত ভিত্তি দাঁড় করান। এছাড়া সিলেট নগরীর পাঠানটুলা শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা (যেখানে তিনি দীর্ঘদিন রেক্টর ছিলেন), মেজরটিলার আল-আমীন জামেয়া উচ্চ বিদ্যালয়, জালালাবাদ ইন্টারন্যাশনাল আলিম মাদ্রাসা এবং সোবহানীঘাটস্থ জালালাবাদ কলেজ প্রতিষ্ঠা ও সুচারু পরিচালনায় তিনি প্রধান উদ্যোক্তার ভূমিকা পালন করেন।

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জমি দান করে তিনি নিজ গ্রাম তালবাড়ীতে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে একটি বিশাল ও দৃষ্টিনন্দন মাদ্রাসা ক্যাম্পাস স্থাপন করেন। সুরমা নদীর ভাঙন থেকে রক্ষা করতে পরবর্তীতে মাদ্রাসাটি বোরহানউদ্দিন রাস্তার পাশে স্থানান্তর করা হয়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান অত্যন্ত চমৎকার, কারণ তিনি সর্বদা মানসম্মত ও আধুনিক দ্বীনি শিক্ষার ওপর জোর দিতেন। এ ছাড়াও সিলেটে ‘আনজুমানে খেদমতে কুরআন’ এবং ‘দি সিলেট ইসলামিক সোসাইটি’র মতো সমাজ ও দ্বীনি খেদমতধর্মী সংগঠন প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন অন্যতম অগ্রদূত।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ব্যবসায়িক উদ্যোগ:

মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী কেবল কিতাবি আলেম বা রাজনীতিক নন, তিনি ছিলেন একজন সফল উদ্যোক্তাও। সিলেটের আধুনিক ও অন্যতম বৃহৎ শপিং কমপ্লেক্স ‘আল-হামরা শপিং সিটি’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। এমন বহু বাণিজ্যিক স্থাপনা ও উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি শত শত যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রেখেছেন। অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন।  

প্রাজ্ঞ মুফাসসির ও বক্তা হিসেবে:

ইলমি ও আধ্যাত্মিক পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি অত্যন্ত উচ্চমানের একজন আলেম ও মুফাসসিরে কুরআন। সমাজ ও রাজনীতির শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি যখনই কুরআনের তাফসির বা ওয়াজ মাহফিলে দাঁড়াতেন, মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত। তাঁর বয়ানে সস্তা কোনো সুর বা কৃত্রিমতা ছিল না, কিন্তু ছিল জ্ঞানের গভীরতা, প্রজ্ঞা ও ইলমের অনন্য ছোঁয়া। অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায় তিনি গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা করতেন। যারা একবার তাঁর বয়ান শুনেছেন, তারা অনুধাবন করতে পেরেছেন যে তিনি কত বড় মাপের তত্ত্বজ্ঞানী আলেম ছিলেন। তাঁর বয়ান শুনে পথের দিশা পেয়েছে, উপকৃত হয়েছে বহু মানুষ। 

ব্যক্তিত্ব ও অবদানের মূল্যায়ন:

মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী একজন অমায়িক, সদালাপী এবং ঋষিতুল্য দূরদর্শী নেতা। দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সজ্জন ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক পরমতসহিষ্ণুতা এবং উদারতার কারণে বিরোধী শিবিরের মানুষও তাঁকে অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা জানাতেন। ক্ষমতার লোভ-লালসা ও সংকীর্ণ রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে তিনি নিজেকে একজন খাঁটি ভদ্রলোক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ফলশ্রুতিতে তাঁর শয্যাপাশে যেমন ছুটে গিয়েছেন বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান, তেমনি বাণিজ্য মন্ত্রী আব্দুল মুক্তাদিরও তাঁকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছেন। আবার হুছামুদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী তাঁকে দেখতে যান। এর আগে হাফিজ আহমদ মজুমদারও তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন। 

মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী যেমন সৎ, তেমনই পরহেজগার। শত ব্যস্ততার মাঝেও নামাজের ওয়াক্ত হওয়ার সাথে সাথে তিনি জায়নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। অনেকবার তাঁর সাথে একই গাড়িতে সফরের সৌভাগ্য হয়েছে, দেখেছি নামাজের প্রতি তাঁর গভীর মনোযোগ। তিনি একজন আপাদমস্তক সত্যবাদী মানুষ; সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য কখনো কাউকে মিথ্যা আশ্বাস দেননি। সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দে যেখানে দুর্নীতির ছোঁয়া থাকে, সেখানে তিনি ছিলেন শতভাগ স্বচ্ছ ও কলঙ্কমুক্ত। 

স্মৃতি সাগরের ঢেউ,কিছু ব্যক্তিগত অনুভূতি:

ব্যক্তিগতভাবে এই মানুষটির সাথে কাটানো কিছু স্মৃতি আজ মনের জানালায় বারবার উঁকি দিচ্ছে। তাঁর কাছাকাছি গেলে কখনো মনে হতো না যে তিনি একজন সংসদ সদস্য বা সাবেক সংসদ সদস্য; বরং একজন অত্যন্ত স্নেহশীল, বিনয়ী ও প্রাজ্ঞ মুরুব্বির অভিভাবকত্ব অনুভব করতাম। মানুষের সুখ-দুঃখে, বিশেষ করে অসুস্থ মানুষের শয্যাপাশে এবং জানাজায় শরিক হওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো ক্লান্তি ছিল না।

স্মৃতিপটে ভেসে উঠছে সেই দিনটির কথা, যেদিন আমার শ্রদ্ধেয় পিতার জানাজা ছিল। পূর্বনির্ধারিত গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও তিনি সব ফেলে আমার বাবার জানাজায় শরিক হয়েছিলেন। সেদিন আমি ছিলাম ইমাম, আর এত বড় একজন নেতা ও সাবেক এই এমপি ছিলেন আমার পেছনের মুসল্লি! শুধু তা-ই নয়, সেদিন বিকেলে তিনি নিজে ফোন করে আমাদের খোঁজ নিয়েছিলেন, সান্ত্বনা ও গভীর শোক প্রকাশ করেছিলেন।

আরেকটি দিনের কথা মনে পড়ে; আমাদের অঞ্চলের একটি গ্রামে এমপি হিসেবে তাঁর রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি শেষ করে তিনি মাগরিবের নামাজ আদায় করলেন। আমি বিনীতভাবে আরজ করলাম, “আমন্ত্রিত মেহমান হিসেবে চলুন আমাদের বাড়িতে একটু চা খেয়ে যান।” তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে অত্যন্ত নিরহংকার চিত্তে আমাদের সাধারণ ড্রয়িংরুমে এসে বসলেন এবং আপ্যায়ন গ্রহণ করলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন প্রথম বর্ষে ভর্তি হই, তখন তাঁর এমপি মেয়াদের শেষ দিক। একদিন হঠাৎ ফোন করে বললেন, “আমার ফ্ল্যাটে চলে এসো, তোমাকে আজ সংসদ ভবনে নিয়ে যাব, অধিবেশন দেখবে।” একজন তরুণের জন্য সেটি কী যে আনন্দের ও গৌরবের ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তাঁর দেওয়া পাস নিয়েই আমার জীবনের প্রথম সংসদ ভবনে প্রবেশ। সাংবাদিকতা পেশায় এসে পেশাগত কারণে সংসদে যেতে হয় এবং আজকের বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনেও সংসদে যাওয়া হবে, কিন্তু তাঁর হাত ধরে সেই প্রথম সংসদ দেখাটাই আমাকে পরবর্তী জীবনে ‘সংসদ বিট’ বা পার্লামেন্টারি জার্নালিজমে কাজ করার গভীর অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।

জীবন সায়াহ্নে:

গত কিছুদিন ধরে তাঁর গুরুতর অসুস্থতার খবর আমাদের সবাইকে গভীরভাবে মর্মাহত করে। দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ তাঁর জন্য দোয়া করছেন। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি যেন তাঁর মহান রবের ডাকে এখনই সাড়া না দেন। আমরা চাই, তিনি আরো কিছুদিন বাঁচুন। আমরা চাই, জনপদের প্রিয় মানুষটি ফিরে আসুক আবার তাঁর প্রিয় জনপদে। আল্লাহ চাইলে কী না পারেন। এই অন্তিম অবস্থা থেকেও আল্লাহ তাঁকে সুস্থ করে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দিতে পারেন। জানিনা কী হবে। তবুও বলতে হয় ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী আজ জীবন সায়াহ্নে। 

ঈদের আগের দিন, ২৭ মে তারিখে, তাঁকে দেখতে যাই সিলেট নগরীর ইবনে সিনা হাসপাতালে। আছেন আইসিইউর বেডে। অক্সিজেন সাপোর্টও তাঁকে দেওয়া হচ্ছে। এর আগের কয়েক দিন থেকে ওই দিন তিনি তুলনামূলকভাবে ভালো ছিলেন। তাকালেন আমাদের দিকে, চিনতে পারলেন। কিছু বলতে চাইলেন, পারলেন না। হাত নাড়াতে চাইলেন, কিন্তু সেই শক্তি যে এখন আর তাঁর নেই। অপলক দৃষ্টিতে সাবেক এই এমপির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। আহা! কী মানুষ আজ কেমন অবস্থায় হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছেন।  

তিনি এখন পর্যন্ত ৮২ বছরের বর্ণাঢ্য, পুণ্যময় ও কর্মমুখর জীবনের অধিকারী এক মানুষ। তিনি আজ আমাদের মাঝে থেকেও চলাফেরায় নেই। কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের অবহেলিত জনপদকে আধুনিকতায় রূপ দেওয়ার পেছনে তাঁর যে অক্লান্ত শ্রম, সততা ও ভালোবাসা—তা তাঁকে এই অঞ্চলের মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে। কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের ইতিহাসের পাতায় প্রিন্সিপাল মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর নাম একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা থাকবে।





শেয়ার করুন

0 comments:

পাঠকের মতামতের জন্য কানাইঘাট নিউজ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়