Monday, July 27

লোভাছড়ার জব্দকৃত পাথর চুরির হিড়িক, রাতের আঁধারে আটগ্রামে পাচার


নিজস্ব প্রতিবেদক:

দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ থাকা সিলেটের কানাইঘাট লোভাছড়া পাথর কোয়ারীর বিভিন্ন এলাকায় মজুদ করে রাখা পরিবেশ অধিদপ্তরের জব্দকৃত পাথর চুরির হিড়িক পড়েছে। পাশাপাশি প্রতিদিন কোয়ারী থেকে অবৈধ ভাবে পাথর উত্তোলন করে বিক্রি করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে গভীর রাতে ইঞ্জিন চালিত ষ্টীলের ভলগেট ও ছোট-বড় ইঞ্জিন চালিত বারকি নৌকা দিয়ে হাজার হাজার ঘনফুট পাথর নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জকিগঞ্জ উপজেলার আটগ্রাম বাজারে। 

বিশ্বস্থ সূত্রে জানা যায়, সুরমা ও লোভা নদীর পানি বেড়ে যাওয়ার কারনে স্থানীয় একটি চক্র লোভাছড়া কোয়ারী থেকে পাথর উত্তোলনের পাশাপাশি রাতের আধারে জব্দকৃত পাথর ভলগেট ও ইঞ্জিন চালিত নৌকা দিয়ে পাচার করছে। তারা কোয়ারী এলাকার সাউদগ্রাম, বড়গ্রাম, ভাল্লুকমারা ও বাজেখেল মৌজা থেকে জব্দকৃত পাথর চুরিতে ব্যস্ত রয়েছে। এ চক্রটির মধ্যে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন ও পাচারের সাথে জড়িত রয়েছেন কোয়ারী এলাকার বাজেখেল গ্রামের আব্দুল্লাহ, ভাল্লুকমারা গ্রামের মুহিব, ডাউকেরগুল গ্রামের সালমান সহ আরো কয়েকজন। প্রতি রাতে তাদের নেতৃত্বে হাজার হাজার ঘনফুট পাথর ভলগেট ও ইঞ্জিন চালিত নৌকা দিয়ে সুরমা নদী হয়ে পাশ্ববর্তী জকিগঞ্জ উপজেলার সুরমা নদীর পাড়ে অবস্থিত আটগ্রাম বাজারে নিয়ে বিক্রি করছেন। আটগ্রাম বাজারে স্থানীয় পাথর ব্যবসায়ী আওয়ামী লীগ নেতা উস্তার আলী মেম্বার, আব্দুল খালিক সহ একটি বড় সিন্ডিকেট অবৈধ এসব পাথর ক্রয় করেন। পাথর ক্রয়ের পর অবৈধভাবে আটগ্রামে গড়ে উঠা ক্রাশার জোনে এসব পাথর ভেঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে তারা বিক্রি করে থাকেন। তবে আটগ্রাম বাজারের পাশে অবৈধভাবে গড়ে উঠা ক্রাশার জোনটি জনবহুল এলাকায় হওয়ায় পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়াও নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক আটগ্রাম আমজাদিয়া দাখিল মাদ্রাসা ও আটগ্রাম সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন, তাদের শিক্ষা প্রতিষ্টানের কাছে অবৈধ এ ক্রাশার জোনটি গড়ে তুলেছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র। বিভিন্ন স্থানে অভিযোগ দেওয়ার পরও তা কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না। এতে পরিবেশ সহ পাঠদানে ব্যাঘাত হচ্ছে।

এদিকে কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের জোরালো কোন ধরনের নজরদারী না থাকায় লোভাছড়ার জব্দকৃত পাথর অবাধে চুরি করে পাচার করা হচ্ছে। প্রতিটি ভলগেট নৌকার ধারণ ক্ষমতা প্রায় হাজার থেকে ১২শ ঘনফুট বলে জানা গেছে। এভাবে দৈনিক ইঞ্জিন চালিত বারকি নৌকা সহ শতাধিক ষ্টীলের ভলগেট দিয়ে পাথর পরিবহন করা হচ্ছে। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা মীম সালমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, লোভাছড়া পাথর কোয়ারী থেকে অবৈধ ভাবে পাথর জকিগঞ্জের আটগ্রাম বাজারে মজুদ করা হচ্ছে। শনিবার (২৫ জুলাই) রাতে পাথর বোঝাই ষ্টীলের ভলগেট থেকে পাথর আনলোড করার দৃশ্যটি তারা ভিডিও ধারণ করেন এবং জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানা পুলিশকে এ বিষয় অবহিত করেন। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন কোন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। যার কারনে তিনি সহ এলাকার সচেতন মহল তাদের ধারণকৃত ভিডিও চিত্রটি পুলিশের সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি’র কাছে পাঠানো পর রবিবার জকিগঞ্জ থানা পুলিশ আটগ্রাম বাজারে গিয়ে লোভাছড়া পাথর কোয়ারী হতে পাচারকৃত পাথরের স্তুপগুলো দেখেন। 

এ বিষয়ে স্থানীয় পাথর ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, কোয়ারীতে থাকা জব্দকৃত পাথর নির্বিচারে রাতের আধারে পাচার করা হলেও জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসন বা পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কোন ধরনের আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। যার কারনে পাথর পাচারের সাথে জড়িত সিন্ডিকেট চক্র প্রতিদিন সরকারী লক্ষ লক্ষ টাকার পাথর চুরি করে জকিগঞ্জের আটগ্রামে নিয়ে বিক্রি করছেন। এছাড়াও জানা গেছে প্রায় মাসখানিক পূর্বে জকিগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভুমি) আটগ্রাম বাজারের জনবহুল এলাকায় সম্পুর্ণ অবৈধভাবে গড়ে উঠা অবৈধ ক্রাশার জোনে অভিযান চালিয়ে উস্তার আলী মেম্বার সহ আরেক অবৈধ পাথর ব্যবসায়ীকে ১ লক্ষ টাকা করে জরিমানা আদায় করেন। এরপরও থেমে নেই উস্তার আলী মেম্বার ও আব্দুল খালিক সহ আটগ্রামে অবৈধভাবে গড়ে উঠা ক্রাশার মেশিনের মালিক ও পাথর ব্যবসায়ীরা। 

স্থানীয় অনেকেই জানিয়েছেন, প্রতিদিন আটগ্রামে লোভাছড়ার পাথর জমজমাট ক্রয়-বিক্রি চলছে। সেখানে অন্তত দৈনিক ২০ লক্ষাধিক টাকার পাথর ক্রয়-বিক্রয় হয়। কিন্তু প্রকাশ্যে আটগ্রামে ক্রাশার জোন সহ পাথর ক্রয়-বিক্রয় হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। 

এ ব্যাপারে কানাইঘাট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভুমি) তাপস চক্রবর্তী তুষার জানান, লোভাছড়া কোয়ারী থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন এবং জব্দকৃত পাথর চুরি রোধে প্রশাসনের নিয়মিত তদারকী রয়েছে। পাথর পাচার বন্ধ করতে প্রশাসনের অভিযান আরো বাড়ানো হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। 

এদিকে আটগ্রামে অবৈধ ক্রাশার জোন ও লোভাছড়ার পাথর ক্রয়-বিক্রয়ের বিষয়ে জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুজিত কুমার চন্দের কাছে জানতে চাইলে তিনি মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি। 

প্রসঙ্গত ২০২০ সালের মার্চে লোভাছড়া পাথর কোয়ারীর লিজের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরিবেশ অধিদপ্তর কোয়ারীতে উত্তোলনকৃত ১ কোটি ৫লক্ষ ঘনফুট পাথর জব্দ করে। জব্দকৃত পাথরের মধ্যে গত বছর পিয়াস এন্টার প্রাইজ নামক প্রতিষ্টানের কাছে ৪৪ লক্ষ ঘনফুট পাথর নিলামে বিক্রি করে। বাদবাকি জব্দকৃত পাথর কোয়ারী এলাকায় মজুদ থাকায় বর্তমানে জব্দকৃত সেই পাথরগুলো চুরি করা হচ্ছে।



শেয়ার করুন

0 comments:

পাঠকের মতামতের জন্য কানাইঘাট নিউজ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়