নিজস্ব প্রতিবেদক :
মসজিদকেন্দ্রিক ধর্মীয় শিক্ষার প্রাথমিক স্তম্ভ মক্তব। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিশুদের কোরআন শিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার পাঠ দিয়ে আসছে এই প্রতিষ্ঠান। অথচ এই শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জীবনমান ও আর্থিক বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই রয়ে গেছে উপেক্ষিত। কানাইঘাট উপজেলার মসজিদের ইমাম ও মক্তব শিক্ষার বর্তমান অবস্থা নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে তাঁদের আর্থিক দুরবস্থার চিত্র।
‘কানাইঘাট উপজেলার মসজিদের ইমাম ও মক্তব শিক্ষার বর্তমান অবস্থা: একটি সমীক্ষা’ শীর্ষক গবেষণা এবং গবেষণাসহ বিভিন্ন লেখার সংকলন ‘চারণধ্বনি’র প্রকাশনা উৎসবে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। গতকাল শনিবার রাতে সিলেট নগরের একটি অভিজাত হোটেলের সম্মেলন কক্ষে কানাইঘাট গণশিক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশন আয়োজিত এ প্রকাশনা উৎসবে কানাইঘাটের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে শিক্ষা, ধর্ম, সমাজসেবা, রাজনীতি ও প্রবাসী কমিউনিটির প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে যেন বসেছিল গুণিজনদের মিলনমেলা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে এবং ধর্মীয় অনুশাসন টিকিয়ে রাখতে প্রথাগত মক্তব শিক্ষাকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। একই সঙ্গে মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সমাজের সম্মানজনক বেতন এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান সমাজ থেকে মক্তব শিক্ষা প্রায় বিলুপ্তির পথে। এর ফলে সামগ্রিক নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষায় গড়ে তুলতে মক্তব শিক্ষার প্রসারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
গতকাল শনিবার রাতে সিলেট নগরের একটি অভিজাত হোটেলের সম্মেলনকক্ষে কানাইঘাট গণশিক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘কানাইঘাট উপজেলার মসজিদের ইমাম ও মক্তব শিক্ষার বর্তমান অবস্থা: একটি সমীক্ষা’ শীর্ষক গবেষণা এবং গবেষণাসহ বিভিন্ন লেখার সংকলন ‘চারণধ্বনি’র প্রকাশনা উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মসজিদের ইমাম ও খতিবদের সম্মানজনক সম্মানী এবং সামাজিক মর্যাদার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায় এমপি আবুল হাসানের বক্তব্যে। তিনি বলেন, সমাজে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও অনেক ইমাম অত্যন্ত অল্প বেতনে জীবনযাপন করছেন। গবেষণায় কোনো কোনো ইমামের মাসিক বেতন সাড়ে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া গেছে, যা বর্তমান বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ বৈষম্যের কারণে মেধাবী ও যোগ্য ব্যক্তিরা এ পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। তাই ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানজনক বেতন ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি।
পিএইচডি গবেষক ও সাংবাদিক এহসানুল হক জসীমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন হাফিজ আজহারুল ইসলাম উসামা। মরমি কবি ইব্রাহিম তশনার ‘তুমি গগনের শশী’ গানটি পরিবেশন করেন আলী হায়দার। এ সময় গবেষণার ফলাফল বড় পর্দায় উপস্থাপন করা হয়।
অনুষ্ঠানে কানাইঘাটের বিশিষ্টজন, শিক্ষাবিদ, আলেম, জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ ও লেখকদের অংশগ্রহণে এক মিলনমেলার সৃষ্টি হয়। বক্তব্যে জেলা ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা এহসানুল হক বলেন, ফুরকানিয়া মক্তব নিয়ে গবেষণাগ্রন্থটি ভবিষ্যতে রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে।
ডা. আবুল কাহের বলেন, মসজিদভিত্তিক মক্তবে শিশুদের যে শিক্ষা দেওয়া হয়, বাসাবাড়িতে গৃহশিক্ষক রেখে তা পুরোপুরি পাওয়া যায় না। এ কারণে সমাজে নৈতিকতার অবক্ষয় বাড়ছে।
জেলা ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা এহসানুল হক বলেন, ফুরকানিয়া মক্তব নিয়ে গবেষণাগ্রন্থটি ভবিষ্যতে রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে।
কানাইঘাট উপজেলা বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশীদ বলেন, মক্তব থেকেই সামগ্রিক শিক্ষার সূচনা হয়। কিন্তু আমরা এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে গেছি। ‘চারণধ্বনি’তে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। ইমামদের মূল্যায়নে সরকার কাজ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জেলা বিএনপির সহসভাপতি মাহবুবুর রব চৌধুরী ফয়সল বলেন, এ আয়োজন কানাইঘাটের গুণীজনদের একত্র করেছে। এ জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই। ইমাম-মুয়াজ্জিনরা যে পরিমাণ বেতন পান, তা অত্যন্ত কম। অথচ আমরা হোটেল-রেস্তোরাঁয় বসে চা পান করতেও অনেক টাকা খরচ করি। ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানজনক বেতন নির্ধারণের পাশাপাশি সন্তানদের নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষায় মক্তব চালু রাখতে সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে।
কানাইঘাট উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, ইমামদের বেতন বাড়াতে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের এগিয়ে আসতে হবে।
দক্ষিণ সুরমা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ইফতেখার আলম বলেন, সমাজে সত্যিকার পরিবর্তন আনতে হলে ঘরে থাকা নারীদেরও এ উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে।
ফুলবাড়ী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা জাকির হোসেন বলেন, কানাইঘাট গণশিক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশন শেকড়ের সন্ধানে কাজ করছে। মসজিদভিত্তিক শিক্ষা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শিক্ষার ধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত। মৃতপ্রায় এ শিক্ষাব্যবস্থাকে আবারও এগিয়ে নিতে হবে।
শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা পাঠানটুলার উপাধ্যক্ষ মাওলানা ফয়জুল্লাহ বাহার বলেন, মসজিদ ইসলামী সভ্যতার বুনিয়াদি কেন্দ্র। মসজিদকেন্দ্রিক মক্তব ইসলামী শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র এবং মূল্যবোধ চর্চার প্রাথমিক ভিত্তি। মক্তব ব্যবস্থা চালু থাকলে সমাজ আরও সুন্দর ও বাসযোগ্য হবে। তাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে মক্তব সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে হবে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ. ফ. ম. জাকারিয়া বলেন, মক্তব শিক্ষা প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থা। ব্রিটিশরা মানুষকে মক্তব থেকে বিমুখ করতে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছিল। এখন সম্মিলিত উদ্যোগে মক্তবকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করতে হবে এবং শিশুদের মক্তবমুখী করতে হবে।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফজলে এলাহি ফয়সাল বলেন, এ অঞ্চলে ইসলামী সংস্কৃতি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। ইমামরা আমাদের নেতা, কিন্তু তাঁদের আমরা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করছি কি না, তা ভেবে দেখা দরকার। তাঁদের বেতনের ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। ইমামদের সম্মানী নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তা করতে হবে। মক্তব শিক্ষা ছাড়া ঈমানি সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না।
কবি কালাম আজাদ বলেন, মক্তব শিক্ষাই মানুষ গঠনের মূল উৎস। মক্তব শিক্ষা হারিয়ে গেলে ইসলামী শিক্ষার ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়বে। এ উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানান।
প্রফেসর ডা. শিব্বির আহমদ শিবলি বলেন, বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে ইমাম ও মক্তব শিক্ষার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। এ উদ্যোগের জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই। যাঁদের এ বিষয়ে কাজ করার কথা ছিল, তাঁরা যথাযথভাবে কাজ করছেন না, যা দুঃখজনক। মক্তবের মাধ্যমেই ইসলামী শিক্ষার পুনর্জাগরণ ঘটেছিল।
সিলেট আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ অধ্যাপক মাওলানা মাহমুদুল হাসান বলেন, মক্তব শিক্ষার ত্রুটিগুলো দূর করে তাওহিদভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করতে হবে। শিশুদের সঠিকভাবে পবিত্র কোরআন শিক্ষা দেওয়ার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে কানাইঘাট গণশিক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি ও অনুষ্ঠান বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যসচিব সৈয়দ আব্দুল মালিক বলেন, গবেষণা করতে গিয়ে মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের বেতনের যে চিত্র পাওয়া গেছে, তা অত্যন্ত হতাশাজনক। সামান্য বেতনে তাঁরা কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। বিষয়টি নিয়ে সমাজের সবাইকে ভাবতে হবে।
লেখকদের পক্ষ থেকে বক্তব্যে শিক্ষক জালাল উদ্দিন বলেন, এ অনুষ্ঠানে গুণীজনদের মিলনমেলা বসেছে। মক্তব শিক্ষাই ছিল মূল শিক্ষা। কিন্তু বর্তমানে সেই শিক্ষা হারিয়ে যাওয়ায় সমাজে অবক্ষয় দেখা দিচ্ছে।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সিলেট পাইলট স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক হাফিজ মো. মাশহুদ চৌধুরী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সিলেট জেলার সহসভাপতি মাওলানা নূর আহমদ কাসেমী, সৌদি প্রবাসীদের পক্ষ থেকে কমিউনিটি নেতা ওয়েস আহমদ, দক্ষিণ বাণিগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লোকমান উদ্দিন, কানাইঘাট উন্নয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সরওয়ার ফারুকী, উপজেলা জামায়াতের আমির কামাল উদ্দিন, লেখক মাওলানা মাহবুব সিরাজী, রাজাগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা শামসুল ইসলাম, জেলা বারের জ্যেষ্ঠ সদস্য অ্যাডভোকেট আখলাকুল আম্বিয়া, মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক আসাদ উদ্দিন, শিক্ষক নেতা মোহাম্মদ এখলাছে এলাহি, শিক্ষক শহিদুল ইসলাম, কানাইঘাট সমিতি সিলেট মহানগরের সেক্রেটারি জাকারিয়া এবং ঝিংগাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাস্টার আবু বকর প্রমুখ।

0 comments:
পাঠকের মতামতের জন্য কানাইঘাট নিউজ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়