মাহবুবুর রশিদ:
যে দিনটি হওয়ার কথা ছিল জীবনের সবচেয়ে আনন্দের, সেই দিনটিই হয়ে উঠল বেদনার প্রতীক। প্রথম সন্তানের মুখ দেখার স্বপ্ন ছিল কাতারপ্রবাসী জুবায়ের আহমদের। হয়তো দূর প্রবাস থেকে বারবার ফোন করে স্ত্রী ও পরিবারের খোঁজ নিতেন, অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন ছোট্ট সন্তানটিকে প্রথমবারের মতো বুকে জড়িয়ে নেওয়ার। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। বাবার মুখ দেখার আগেই পৃথিবীর আলো দেখল জুবায়েরের নবজাতক কন্যা।
কানাইঘাট উপজেলার ঝিংগাবাড়ী ইউনিয়নের মাঝতালুক গ্রামের বাসিন্দা জুবায়ের আহমদ গত ২১ জুন কাতারে সংঘটিত এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। একই দুর্ঘটনায় আরও চার কানাইঘাটী প্রবাসীর মৃত্যু হয়। এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো কানাইঘাটজুড়ে।
গত ৩০ জুন জুবায়েরসহ পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ দেশে পৌঁছায়। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। শেষবারের মতো প্রিয়জনের মুখ দেখে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যায়, জুবায়েরের মৃত্যুর মাত্র ১৮ দিন পর, তার ঘর আলো করে জন্ম নেয় এক ফুটফুটে কন্যাসন্তান। যে শিশুকে ঘিরে একজন বাবার হাজারো স্বপ্ন, ভালোবাসা আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা থাকার কথা ছিল, সেই শিশুই পৃথিবীতে এলো বাবার স্নেহ, স্পর্শ ও মুখ না দেখেই।
একদিকে নবজাতকের জন্মে পরিবারে এসেছে নতুন জীবনের আনন্দ, অন্যদিকে এই আনন্দের মধ্যেও রয়ে গেছে এক গভীর শূন্যতা। শিশুটির প্রথম কান্না যেন আরও একবার মনে করিয়ে দিল-তার বাবা আর কোনোদিন তাকে কোলে নিতে পারবেন না, আদর করে ডাকতে পারবেন না কিংবা তার বেড়ে ওঠার সাক্ষী হতে পারবেন না।
এই পরিবারের বেদনার ইতিহাস আরও দীর্ঘ। প্রায় ১২ বছর আগে সৌদি আরবে এক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান জুবায়েরের বাবা আহসান উল্লাহ। বাবাকে হারানোর সেই শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই একই পরিণতির শিকার হলেন জুবায়ের। যেন একই পরিবারের বুকে বারবার আঘাত হেনেছে নির্মম নিয়তি।
পরিবারের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে কাতারে গিয়েছিলেন জুবায়ের। কিন্তু একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই থামিয়ে দেয় তার সব স্বপ্ন। রেখে যান অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী, শোকাহত স্বজন এবং এমন এক কন্যাসন্তানকে, যে সারাজীবন বাবার গল্প শুনেই বড় হবে-কিন্তু কোনোদিন বাবাকে দেখার সৌভাগ্য হবে না।
ঝিংগাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বকর বলেন, “বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জুবায়ের আহমদের ঘরে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়েছে। আমি নবজাতককে দেখতে এবং পরিবারের খোঁজখবর নিতে তাদের বাড়িতে যাচ্ছি।”

0 comments:
পাঠকের মতামতের জন্য কানাইঘাট নিউজ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়