আব্দুল হালিম::
বোধোদয় হওয়ার পর থেকেই রোজা রেখে আসছি। মাঝে মাঝে হয়তো দু’একবার ভেঙেছি,যতদূর মনে পড়ে। তবে শৈশবের রমাদান ছিল একেবারেই ভিন্নরকম।
তখন সাহরি খাওয়ার সুযোগ খুব কমই হতো। মাইকের আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যেত না, মোবাইল ফোন ছিল না, ঘরেও ছিল না কোনো ঘড়ি। সময় বোঝার একমাত্র ভরসা ছিল অনুমান। বাবা বাজার থেকে ফিরতেন গভীর রাতে,বারোটার আগে কখনোই নয়। বাজারের সওদাসামগ্রী গুছাতে গিয়েই মায়ের অনেক রাত হয়ে যেত। কখনো কখনো সেই গুছাতে গুছাতে সাহরির সময় হয়ে যেত-সেদিন অনেকের সাহরি খাওয়ার সুযোগ মিলত।
আবার এমনও হতো-মা গভীর রাতে ঘুমালেন, কিন্তু সাহরির চিন্তায় মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল। তখন দুশ্চিন্তা-সময় হয়েছে, নাকি শেষ? মাইকের আওয়াজ না পেলেই এমন অনিশ্চয়তা তৈরি হতো। পাশের বাড়ির মানিক চাচা ও ফখর চাচা প্রায়ই সাহরির সময় ডাক দিতেন। কিন্তু আমরা দেরিতে উঠলে তাঁদের ডাকার সুযোগও হাতছাড়া হয়ে যেত। কখনো মাইকের আওয়াজ না শুনতেই হঠাৎ আজানের ধ্বনি-অথবা ভোরের আলো।
ফখরুদ্দিন চাচা আজ আর নেই। প্রায় এক যুগ আগে ইন্তেকাল করেছেন। দাদির দাফনের দিন তিনি আগত অতিথিদের আপ্যায়নের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। আল্লাহ তাঁর মাগফিরাত করুন।
চোঙা থেকে মাইক: এক যুগের পরিবর্তন
আমাদের গ্রামের পূর্বদিকে ভারতের তেরাপুর গ্রামের মাইকের আওয়াজ মাঝেমধ্যে ভেসে আসত। দক্ষিণ দিক থেকে সুরমা নদীর উত্তর পাড়ের মরিচাসহ বৃহত্তর আটগ্রামের ধ্বনিও শোনা যেত।
তখন আমাদের গ্রামে চারটি মসজিদ ছিল-এখন পাঁচটি। কিন্তু কোনো মসজিদেই মাইক ছিল না। নামাজের সময় উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে চোঙা দিয়ে আজান দেওয়া হতো। সাহরির সময়ও একইভাবে ঘোষণা দেওয়া হতো। কেউ ইন্তেকাল করলে উঁচু টিলায় উঠে চারদিকে চোঙা ঘুরিয়ে সংবাদ জানানো হতো-তবু সেই আওয়াজ খুব বেশি দূর পৌঁছাত না।
এক রমাদান মাসে প্রথমবারের মতো মসজিদে মাইক লাগানো হলো। কী আনন্দ! যেন এক নতুন যুগের সূচনা। আধুনিকতার স্পর্শে গ্রাম যেন নতুন প্রাণ পেল। সাহরির সময় গজল বাজত, সাহরি শুরু হলে কুরআন তিলাওয়াত বা ওয়াজ শোনা যেত। কেউ বিরক্ত হতো না, কেউ অভিযোগ করত না-বরং সবার মাঝে ছিল উৎসবের আমেজ।
ঢাকার অভিজ্ঞতা: ‘ভোরের পাখি’
২০১০ সাল। আমি তখন গাউছিয়া ইসলামিয়া ফাযিল মাদরাসা ছাত্রাবাসের পঞ্চম তলায় থাকি। জীবনের প্রথম রমাদান ঢাকায়।
সাহরির সময় অলিগলিতে ঢোলের আওয়াজ আর সুরেলা কণ্ঠে ডাকা-এক নতুন অভিজ্ঞতা। বেশ ভালো লাগত। প্রতিদিন সেই ডাক শুনে সাহরিতে উঠতাম। ওদেরকে বলা হতো ‘ভোরের পাখি’। যদিও শোনা যায়, তাঁদের অনেকেই নিজেরা রোজা রাখতেন না। ঈদের আগে সাহরিতে ডাকাডাকির জন্য প্রতি বাসা থেকে চাঁদা তোলা হতো।
২০০৭ ও ২০০৯ সালের রমাদান কেটেছে সিলেটে। সেখানে এমন সংস্কৃতি দেখিনি,এখন আছে কি না জানা নেই। তবে ইদানীং ঢাকায় রমাদান ছাড়াও ফজরের আগে নানা সুরে ডাকাডাকি শোনা যায়। সম্ভবত সেটি চাঁদাবিহীন উদ্যোগ।
সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও বাস্তবতা
সাহরির জন্য মাইকে ডাকা আমাদের সংস্কৃতিরই অংশ। একে পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যুগের পরিক্রমায় পদ্ধতি বদলেছে,চোঙা থেকে ব্যাটারিচালিত মাইক, আর এখন বিদ্যুৎচালিত সাউন্ড সিস্টেম।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রথম বিদ্যুতের ব্যবহার শুরু হয় ১৯০১ সালে, আহসান মঞ্জিল-এ। তার আগে এ ভূখণ্ডে বিদ্যুৎ ছিল না। প্রান্তিক জনপদে ঘড়ির ব্যবহারও ছিল সীমিত। মসজিদের আজানই ছিল সময় জানানোর প্রধান মাধ্যম। এখনো অধিকাংশ মানুষ মাগরিবের আজান শুনেই ইফতার করেন, সাহরির শেষ করেন মাইকের ধ্বনি শুনে।
কিন্তু সময় বদলেছে। ঘরে ঘরে ঘড়ি, হাতে হাতে মোবাইল ফোন। কুরআন তিলাওয়াত, ওয়াজ, গজল-সবই এখন হাতের মুঠোয়। ফলে অতিরিক্ত শব্দ অনেকের কাছে বিরক্তিকর মনে হয়। কোথাও কোথাও সাহরির সময় দীর্ঘক্ষণ মাইক বাজতে থাকে-যা শব্দদূষণ সৃষ্টি করে এবং দৈনন্দিন কাজে বিঘ্ন ঘটায়।
তাই প্রয়োজন সংযম ও সচেতনতা। মাইকের ব্যবহার বন্ধ নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা উচিত। কারণ এটি কেবল প্রযুক্তির বিষয় নয়-এটি আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সামাজিক স্মৃতি, আমাদের সংস্কৃতিরই এক অনুষঙ্গ।
লেখক: প্রভাষক,কালনী ইসলামিয়া ফাযিল মাদরাসা, গাজীপুর

0 comments:
পাঠকের মতামতের জন্য কানাইঘাট নিউজ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়