মাহবুবুর রশিদ:
একটি প্রবাদ আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি “এক দেশের বুলি, আরেক দেশের গালি।” কথাটা শুনতে যত সহজ, এর ভেতরের অর্থ ততটাই গভীর ও রঙিন। এক দেশে যেটা মায়া-মমতার ভাষা, অন্য দেশে সেটাই কখনো হাসির খোরাক, কখনো আবার বিব্রতকর হয়ে উঠতে পারে। ভাষা সত্যিই অদ্ভুত-জায়গা বদলালেই তার রূপ, স্বর আর মেজাজ বদলে যায়।
এই যেমন ধরা যাক সিলেটি ভাষা। আমাদের কাছে এটি প্রাণের ভাষা-মায়ের ডাক, ঘরের কথা, আবেগের রঙে রাঙানো এক পরিচিত সুর। কিন্তু সেই একই ভাষা যদি হঠাৎ করে কানাডার কোনো ঝকঝকে হলরুমে, গমগমে ইংরেজি বক্তৃতার মাঝখানে ঢুকে পড়ে-তখন কেমন দৃশ্য তৈরি হয়?
এর একটি দারুণ উদাহরণ হয়ে উঠেছেন সিলেটের মেয়ে ডলি বেগম। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই কানাডীয় নাগরিকের জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়। শৈশব কেটেছে প্রিয় মাতৃভ‚মিতে, পরে সপরিবারে পাড়ি জমান কানাডায়।
সম্প্রতি কানাডার ফেডারেল নির্বাচনে এমপি হিসেবে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে তিনি যখন বিজয় বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, তখন সবকিছুই চলছিল নিয়মমাফিক। চারপাশে স্মার্ট পোশাক, গম্ভীর পরিবেশ, ইংরেজি ভাষণের ছড়াছড়ি। ডলি বেগমও সাবলীল ইংরেজিতে সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছিলেন-দল, সমর্থক, ভোটার সবাইকে।
হঠাৎ করে তিনি চলে এলেন মায়ের প্রসঙ্গে। আর ঠিক তখনই, অজান্তেই বুকের গভীর থেকে বেরিয়ে এলো সেই চিরচেনা সিলেটি ডাক-
“মাই...মাই খই গেছইন!” অর্থাৎ, মাকে খুঁজতে গিয়ে বলা “মা কোথায় গেলেন?”
এই একটিমাত্র লাইনেই বদলে গেল পুরো পরিবেশ। গম্ভীর হলরুমে ছড়িয়ে পড়ল হাসির ঢেউ। কেউ হেসে ফেললেন, কেউ হাততালি দিলেন, কেউ আবার উল্লাসে চিৎকার করে উঠলেন“ডলি! ডলি!” আর ডলি বেগম নিজেও হাসি চাপতে পারলেন না,আবেগ আর আনন্দ মিলেমিশে একাকার।
আসলে এই ছোট্ট ঘটনাটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে একটি বড় সত্য-মানুষ তার শেকড় কখনও ভুলে না। যত দূরেই যাক, যত বড় মঞ্চেই উঠুক, মায়ের ভাষা কোনো না কোনোভাবে ঠিকই বেরিয়ে আসে।
সিলেটের মানুষ তো আনন্দে আত্মহারা! এমপি হওয়াটা নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়, কিন্তু তার চেয়েও বড় আনন্দ-ডলি বেগম এখনো “মাই” ভুলে যাননি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এখন একটাই সুর-
“ডলি বেগম তার শেকড় ভুলে যাননি!”
কেউ লিখছেন-“এটাই তো আসল পরিচয়!”
আবার কেউ মজা করে বলছেন-“ইংরেজি ভাষণের মাঝেও সিলেটি ঢুকবেই!”
সব মিলিয়ে, এটি শুধু হাসির ঘটনা নয়,এটি আবেগের, পরিচয়ের, আর নিজের শেকড়কে হৃদয়ে ধরে রাখার গল্প।
শেষ কথা একটাই-ভাষা বদলায়, দেশ বদলায়, মঞ্চ বদলায়...কিন্তু “মাই” ডাকার সুর কখনও বদলায় না। আসুন, আমরাও ডলি বেগমের মতো পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি না কেন-মা, মাটি আর শেকড় যেন কখনও ভুলে না যাই।
লেখক: মাহবুবুর রশিদ,সাধারণ সম্পাদক,কানাইঘাট প্রেসক্লাব
খবর বিভাগঃ
মতামত

0 comments:
পাঠকের মতামতের জন্য কানাইঘাট নিউজ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়