Wednesday, April 15

কানাইঘাটের মাটিতে চিরনিদ্রায় বীরেরা, স্মরণে ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান


এহসানুল হক জসীম:

সিলেট জেলার কানাইঘাট উপজেলায় ১৯৭১ সালের ২৬ নভেম্বর এক রক্তক্ষয়ী সম্মুখ যুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে শহীদ হন ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান বীরউত্তমসহ আরও অনেকে। আজকের আলোচনায় আমরা স্মরণ করছি এই বীর সেনানীকে, যার আত্মত্যাগ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

একাত্তরের সেই দিনেই তাঁকে সমাহিত করা হয় কানাইঘাট উপজেলার সাতবাক পরগনার ৩ নং দিঘীরপার ইউনিয়নের রামধরণেরমাটি (দিঘীরপার) এলাকায়, সাতবাক ঈদগাহ মাদ্রাসার কবরস্থানে। একই কবরস্থানে শায়িত আছেন ভাষাবিদ ইসমাইল আলম (ইব্রাহিম তশ্নার ভাই) এবং হাফিজ মাওলানা আব্দুন নুরসহ আরও কয়েকজন গুণী ব্যক্তি। এখান থেকে অল্প দূরত্বে অবস্থিত হারিছ চৌধুরীর বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত একটি এতিমখানা, যার কম্পাউন্ডেই পুনরায় সমাহিত করা হয়েছে হারিছ চৌধুরীকে। গত ১২ এপ্রিল এই স্থানগুলো জিয়ারত করতে গিয়ে বীরউত্তম মাহবুবুর রহমানের কবরের সামনে থাকা ফলকের তথ্য যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া যায় ২২ নভেম্বর নয়, ৪ ডিসেম্বরই কানাইঘাট মুক্ত হয়।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে কানাইঘাট বিজয় ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই বিজয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল পুরো সিলেট অঞ্চলের মুক্তি। কানাইঘাট মুক্ত হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা সিলেট শহরের দিকে অগ্রসর হন এবং শেষ পর্যন্ত সিলেটও শত্রুমুক্ত হয়। এই বিজয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীরউত্তম, শহীদ ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান বীরউত্তম, মেজর সি. আর. দত্ত, মেজর ওয়াকার হাসান এবং মেজর হাফিজউদ্দিন আহমদ বীরপ্রতীক প্রমুখ।

১৯৭১ সালের ২৬ নভেম্বর কানাইঘাটে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ নেন ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান। যুদ্ধ চলাকালীন একটি কামানের গোলা তাঁর শরীরে আঘাত হানলে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। কিন্তু মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও তিনি দমে যাননি। রক্তাক্ত অবস্থায়ও সহযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়ে লড়াই চালিয়ে যান এবং শত্রু বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করেন। তাঁর এই আত্মত্যাগ কানাইঘাট মুক্তির পথকে সুগম করে তোলে। পরবর্তীতে ধারাবাহিক যুদ্ধের মাধ্যমে ৪ ডিসেম্বর কানাইঘাট শত্রুমুক্ত হয়।

প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা:

১৯৪৪ সালে দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ থানার ভাদুরিয়া ইউনিয়নের পলাশবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মাহবুবুর রহমান। তাঁর পিতা এ. এম. তাসিরউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী এবং মাতা জরিনা খাতুন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। দিনাজপুর জিলা স্কুল থেকে ১৯৬২ সালে এসএসসি এবং ১৯৬৪ সালে দিনাজপুর কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর তিনি ঢাকা ডেন্টাল কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু দেশের সেবায় আত্মনিয়োগের দৃঢ় প্রত্যয়ে তিনি সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন।

সামরিক জীবন ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ:

১৯৬৬ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন মাহবুবুর রহমান। ১৯৬৯ সালের ২০ এপ্রিল ৪০তম পিএমএ লং কোর্সের সঙ্গে কমিশন লাভ করে তিনি ২৪ ফ্রন্টিয়ার ফোর্সে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বাঙালি অফিসারদের সরিয়ে দেওয়ার কৌশলের অংশ হিসেবে তাঁকে যশোর সেনানিবাসে ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলি করা হয়। পরে এই রেজিমেন্ট সিলেট অঞ্চলে স্থানান্তরিত হলে তিনি সেখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি:

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর ‘বীরউত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক পদক। তাঁর এই আত্মদান স্বাধীনতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

কানাইঘাটের মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত এই বীর সেনানী আমাদের গর্ব, আমাদের প্রেরণা। একই মাটিতে শায়িত আছেন আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা খাজা নিজাম উদ্দিনও। তাঁদের আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে যাবে চিরকাল।


শেয়ার করুন

0 comments:

পাঠকের মতামতের জন্য কানাইঘাট নিউজ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়