এহসানুল হক জসীম::
নির্বাচনের দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর পর ‘হেরে যাওয়া’ স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি নেতা মোঃ সুহেল আমিনকে সিলেট জেলার কানাইঘাট পৌরসভার মেয়র হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে।
বুধবার (৭ জানুয়ারি ২০২৬) সিলেটের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ এবং নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বিচারক বিশ্বেশ্বর সিংহ ২০২১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী লুৎফুর রহমানকে ‘নির্বাচিত ঘোষণা’ বাতিল করে ‘জগ’ প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী সুহেল আমিনকে কানাইঘাট পৌরসভার মেয়র ঘোষণা করেন। সাত দিনের মধ্যে গেজেট প্রকাশের জন্য নির্বাচন কমিশন সচিবালয়কে আদেশ দিয়েছে।
মামলার বাদি সুহেল আমিন এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে ডেইলি সানকে বলেন, “অবশেষে সত্যের বিজয় হয়েছে। নির্বাচনে আমার প্রাপ্ত ভোট বেশি থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় সেই সময় ক্ষমতার প্রভাবে জোরপুর্বকভাবে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি লুৎফুর রহমানকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিলো। অবশেষে আদালতের রায়ে আমি নির্বাচিত মেয়রের ঘোষণা পেলাম, আলহামদুলিল্লাহ।”
প্রায় পাঁচ বছর পর মেয়র ঘোষণার পর সুহেল আমিন চেয়ারে বসতে পারবেন কিনা- সেটা স্পষ্ট নয়। আদালতের রায়ে নির্বাচিত মেয়র ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশের নির্দেশ থাকলেও শপথ প্রদান সংক্রান্ত কোন নির্দেশনা নেই। ফলে অভিজ্ঞরা মনে করছেন, সুহেল আমিনকে মেয়র পদে বসানোর জন্য শপথ ও দায়িত্ব প্রদান সংক্রান্ত বিষয়টি এখন নির্ভর করছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপর। আবার যেহেতু সেই সময়ের নির্বাচিত সকল মেয়রকে অপসারিত করা হয়েছে, ফলে উনার পদে বসার ব্যাপারে জটিলতাও আছে।
এই ব্যাপারে সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবি জহিরুল ইসলাম মুসা ডেইলি সানের সাথে আলাপকালে বলেন, সিলেটের আদালতের এই রায়ের পর নির্বাচন কমিশনের সুযোগ রয়েছে উচ্চ আদালতে আপিল করার। কমিশন যদি আপিল করে, তাহলে সেক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার প্রয়োজন পড়বে সংশ্লিষ্ট ওই ব্যক্তির মেয়র পদে শপথ ও চেয়ারে বসার জন্য। অন্যদিকে, যেহেতু গেজেট প্রকাশ করে সেই সময়ের নির্বাচিত সকল মেয়রকে অপসারণ করা হয়েছে, ফলে এই দিক বিবেচনা করলে উনার মেয়র পদে বসার সুযোগ নেই।
কানাইঘাটের এক বিএনপি নেতা বলেন, আইন অনুযায়ী সুহেল আমিন মেয়র পদে বসতে পারবেন কিনা, সেটা এক বিষয়; কিন্তু এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, কারচূপি করে গায়ের জোরে সেদিন আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে মেয়র ঘোষণা করা হয়েছিলো। তার শাস্তির পাশাপাশি ওই সময়ে প্রশাসনের যারা নির্বাচনী দায়িত্বে ছিলেন, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার।
সিলেট জেলার কানাইঘাট পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো ২০২১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে অন্য আরো কয়েকজনের সাথে কানাইঘাট উপজেলা বিএনপির ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক মোঃ সুহেল আমিনও অংশগ্রহণ করেছিলেন। নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী লুৎফুর রহমানকে ১৪৬ ভোট বেশি দেখিয়ে তখন বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
মেয়র পদের ফলাফলে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ উঠেছিলো তখনই। ফলাফল মেনে নিতে পারেননি সুহেল আমিন। পুণরায় ভোট গণনার আবেদন নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন। দীর্ঘ প্রায় পৌনে পাঁচ বছর পর এখন থেকে দুই মাস আগে গত ১০ নভেম্বর তারিখে সিলেটের এই আদালতে বিচারকের উপস্থিতিতে ভোট গণনায় দেখা যায়, সুহেল আমিন ৬৮৪ ভোট বেশি পেয়েছিলেন। আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়ে আজ লিখিত রায় প্রদান করেন।
সুহেল আমিন বলেন, নির্বাচনের সাথে সম্পৃক্ত সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্রগুলোর পোলিং অফিসারদের দিয়ে বিচারকের উপস্থিতিতে আদালতে ভোট পুণঃগণনায় দেখা যায়, লুৎফুর রহমানের ব্যালটের বান্ডিলে ৫৫৪ টি সাদা ব্যালট ঢুকানো হয়েছিলো। আরো অনিয়ম করা হয়।
আদালতের গণনা অনুযায়ী, ‘জগ’ প্রতীক নিয়ে সোহেল আমিন ৬৮৪ ভোটে এগিয়ে ছিলেন। অথচ তাঁকে পরাজিত দেখিয়ে নৌকার প্রার্থীকে ১৪৬ ভোট বেশি দেখিয়ে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছিলো।
মেয়র পদে সেই সময়ের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী লুৎফুর রহমানকে নৌকা প্রতীকে ৩,৮৩২ ভোট দেখিয়ে সেই সময়ের কানাইঘাট পৌর নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সিনিয়র জেলা নির্বাচন অফিসার ফয়সল কাদের বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করেন। পরে সেই অনুযায়ী গেজেট প্রকাশিত হয়।
সুহেল আমিনকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩,৬৮৬ ভোট দেখানো হয়। মেয়র প্রার্থী ছিলেন ছয় জন। সেই সময়ের ঘোষিত ফলাফলে, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মো. নিজাম উদ্দিন নারিকেল গাছ প্রতীকে তৃতীয় সর্বোচ্চ ৩,০ ৬৩ ভোট পান। ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী মো. শরিফুল হক ২,৫২০ ভোট পেয়েছিলেন, মোবাইল ফোন প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী কাওছার আহমদ ৬১৩ ভোট এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নজির আহমদ হাতপাখা প্রতীকে পেয়েছিলেন ২১২ ভোট।
তিনটি ভোটকেন্দ্রে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনে ভোট পুণঃগণনার আবেদন জানিয়ে হাইকোর্টে একটি রিট মামলা দায়ের করেছিলেন সুহেল আমিন। ২০২১ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারী তারিখে হাইকোর্ট এক আদেশে ৮ সপ্তাহের জন্য লুৎফুরকে মেয়র ঘোষণা করে প্রকাশ করা গেজেট ও শপথ স্থগিত করেন। আপিল বিভাগের চেম্বার জজের কাছে লুৎফুরের আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ স্থগিত হয়ে যায়। সেই সুযোগে আওয়ামী লীগ নেতা লুৎফুর রহমান মেয়র পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে অপসারিত হওয়ার আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে আপিল বিভাগে শুনানীর পর ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ আদালত সিলেটের নির্বাচনী ট্রাইবুন্যালকে ৬০ দিনের মধ্যে এই মামলা নিষ্পত্তির আদেশ দেন। সুপ্রীম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী অবশেষে আদালত ৬০ দিনের স্থলে দুই বছরেরও অধিক সময় নিয়ে বিষয়টি নিষ্পত্তি করেন।
১০ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে আদালতে কানাইঘাট পৌরসভাধীন ফাটাহিজল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শিবনগর দারুল কোরআন মাদ্রাসা এবং দুলর্ভপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের ভোট গণনা করা হয়।
সবচেয়ে বেশি ভোট কারচুপির অভিযোগ ছিলো ফাটাহিজল কেন্দ্রে। এই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার ছিলেন শাখাওয়াত হোসেন। সেই সময় উচ্চ আদালত তাঁকেও সশরীরে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা প্রদানের নির্দেশ প্রদান করেছিলেন।
ফাটাহিজল কেন্দ্রে মোট ভোট ছিল ২৭১১। কানাইঘাট পরিসংখ্যান অফিসের সেই সময়ের তথ্যমতে, এখানকার ৫২৯ জন ভোটার প্রবাসী ছিলেন, এই তালিকার অনেকে মৃত্যুবরণও করেন। এই ভোটকেন্দ্রের জীবিত ও দেশে থাকা ভোটারের শতভাগ ভোট কাস্টিং হলেও ২১৮২ ভোট হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু রিটার্নিং অফিসার থেকে প্রদত্ত ভোটার তালিকায় ২৬১১ ভোট কাস্টিং দেখানো হয়, যা অস্বাভাবিক ও ভুতুড়ে ছিলো।
সুহেল আমিন বলেন, ফাটাহিজল কেন্দ্রে তাঁর প্রকৃত প্রাপ্ত ভোট ছিলো কিন্তু ৬৬৬, দেখানো হয়েছিলো ২৬৯; দুর্লভপুর কেন্দ্রে ৭১৩ ভোট পেলেও দেখানো হয় ৫১৩ আর শিবনগর মাদ্রাসা কেন্দ্রে ২৮৯ ভোট পেলেও দেখানো হয় ৮৯ ভোট।

0 comments:
পাঠকের মতামতের জন্য কানাইঘাট নিউজ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়