Monday, May 11

কানাইঘাটে ভাল্লুক ভেবে বিরল বন্য শূকরকে পিটিয়ে হ*ত্যা

ধরার পর শেকলে বাঁধা শূকর-ভাল্লুক। মারা যাওয়ার পর বন বিভাগ মাটিচাপা দেয়। ছবি: খবরের কাগজ

কানাইঘাট নিউজ ডেস্ক:

বাঘ শিকারের অন্যতম পদ্ধতি ‘বাঘ কেওড়’। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী এলাকা সিলেটের কানাইঘাটের বিভিন্ন গ্রামে এই পদ্ধতির প্রচলন রয়েছে। সম্প্রতি ‘বাঘ কেওড়’ দিয়ে ভাল্লুক ধরা হয়েছে—এমন ধারণা থেকে ভারতীয় একটি বন্য শূকরকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। প্রাণিটি বাংলাদেশের বনে খুবই বিরল। লম্বাটে এবং শরীরের গড়ন কিছুটা ভাল্লুকের মতো হওয়ায় এগুলোকে ‘শূকর-ভাল্লুক’ বলা হয়।

বনকর্মীরা জানিয়েছেন, এই এলাকায় হিংস্র বন্য প্রাণীর বিচরণ রয়েছে। খাবারের সন্ধানে এসব প্রাণী হন্যে হয়ে এসে মানুষের ওপর আক্রমণ করে। মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও রয়েছে। এ কারণে এসব প্রাণী নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি দেখা যায়। তবে পরিবেশ সংগঠকদের মতে,  ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এখানে এসব প্রাণীর আসা-যাওয়াটা স্বাভাবিক। হয়তো ভারতীয় অংশে খাবারের সংকট দেখা দেওয়ায় এসব প্রাণী এপারে চলে আসে। বিষয়টি নিয়ে দুদেশের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাজ করা উচিত।

গত শনিবার সন্ধ্যায় বন বিভাগের কানাইঘাট রেঞ্জ থেকে শূকরটি হত্যার তথ্য নিশ্চিত করা হয়। বন বিভাগের স্থানীয় বিট অফিস সূত্র জানায়, বন্য শূকরটি ভারত থেকে বাংলাদেশে নেমে এসেছিল। স্থানীয় লোকজন এটিকে ভাল্লুক ভেবে লোহার জিঞ্জির দিয়ে আটকে পিটিয়ে হত্যা করে। বন বিভাগের স্থানীয় বিট কর্মীরা খবর পেয়ে বন্য শূকরটি উদ্ধার করে চিকিৎসালয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে এটি মারা যায়। পরে এটিকে মাটিচাপা দেওয়া হয়।

শূকর-ভাল্লুকটিকে আটকে রেখে পেটানোর একটি ভিডিওচিত্র প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। তাতে দেখা যায়, লোহা দিয়ে উপর্যুপরি পেটানোর পর একপর্যায়ে এটি নিস্তেজ হয়ে পড়ে। কানাইঘাটের বাংলাবাজার থেকে এ দৃশ্য দেখে স্থানীয় এক যুবক বন বিভাগে খবর দিলে শুক্রবার বিকেলে সেটি উদ্ধার করা হয়। কিন্তু চিকিৎসা দিতে নিয়ে যাওয়ার পথেই এটি মারা যায়। 

সিলেট বন বিভাগের রেঞ্জ অফিসার শাহ আলম বলেন, ‘মুমূর্ষু অবস্থায় পেয়ে প্রাণীটিকে আমরা উদ্ধার করে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু পারা যায়নি। বন্য শূকরটিকে ভাল্লুক ধারণা করে এলাকাবাসী মেরেছে। আঘাতের পর আঘাতে সেটি মারা যায়।’

রেঞ্জ কর্মকর্তা জানান, শূকর-ভাল্লুক অথবা বন্য শূকর বাংলাদেশে নেই। এগুলো ভারতের বনে বসবাস করে। সেখানেও বিরল। ওপার থেকে এপারে বন্য প্রাণী আসায় স্থানীয় লোকজন তটস্থ থাকেন। শূকরগুলো হন্যে হয়ে এসে মানুষজনের ওপর আক্রমণ করে। এতে মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এ কারণে সেখানে ভারতীয় হিংস্র প্রাণীর আক্রমণ-আতঙ্ক রয়েছে। 

জানা গেছে, ভারতের মেঘালয় রাজ্যের জঙ্গল থেকে বাংলাদেশের সীমান্তের এপারে নয়টি গ্রাম বাঘসহ ভারতীয় বন্য প্রাণীর বিচরণক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত। ২০০৯ সালে ওই এলাকা থেকে বিরল কালো বাঘ (ব্ল্যাক প্যানথার) জ্যান্ত অবস্থায় ‘বাঘ কেওড়ে’ ধরা পড়েছিল। এরপর থেকে সেখানে কেওড় প্রথা প্রচলিত রয়েছে।

এলাকাবাসীর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বাংলাবাজার ছাড়াও কানাইঘাটের বাগফৌজ, কালীনগর, লক্ষ্মীপ্রসাদ, পাটানিপাড়া, বউলবাগ, তৃতীয় বউলবাগ, বিহারীপাড়া, পশ্চিম বিহারীপাড়া ও নয়াখেল এলাকায় ভারতীয় প্রাণীর বিচরণ দেখা যায়। এই ৯টি গ্রামের ১৮টি মহল্লায় প্রায় ১০ হাজার পরিবারের বসবাস। সর্বশেষ ২০১৯ সালে সেখানে কেওড় দিয়ে একটি বাঘ জ্যান্ত ধরা হয়েছিল। তবে সেটি রাখা যায়নি। ভারতের জঙ্গলে ছুটে গিয়েছিল।

শূকর-ভাল্লুকটিকে পেটানোর ভিডিও দেখেছেন সিলেটের পরিবেশ ও প্রাণী অধিকার সংগঠনের সংগঠক, ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’র (ধরা) কেন্দ্রীয় সদস্য আবদুল করিম চৌধুরী কিম। তিনি ভিডিওটি বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নজরে দিয়েছেন জানিয়ে বলেন, ‘ওপার থেকে এপারে হিংস্র প্রাণী আসবে, তাতে মানুষের বসবাস অনিরাপদ হবে, এটা স্বাভাবিক। এলাকাটির ভৌগোলিক কাঠামো যেহেতু এমন, সেখানে বন বিভাগের প্রাণী সংরক্ষণ দপ্তরের নজরদারি বাড়ানো উচিত।’ তার মতে, ভারতীয় বনজঙ্গলে হয়তো খাবার সংকট, তাই এগুলো এপারে আসছে। এতে দুই দেশের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

সৌজন‌্য: খবরের কাগজ


শেয়ার করুন

0 comments:

পাঠকের মতামতের জন্য কানাইঘাট নিউজ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়