মাহবুবুর রশিদ ::
নির্বাচনের একজন প্রার্থীর সঙ্গে বিয়ের বর-কনের আশ্চর্য রকমের মিল রয়েছে। হয়তো অনেকেই প্রথমে বলবেন,এটা আবার কিভাবে সম্ভব? বিষয়টি একটু ভেবে দেখলে মিলগুলো খুব সহজেই চোখে পড়ে।
বিয়ের ক্ষেত্রে যখন একজন বর কিংবা কনের খোঁজ করা হয়, তখন প্রথমেই দেখা হয় তার আখলাক, চরিত্র, পারিবারিক পরিচয়, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যক্তিগত আচরণ। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, পরিচিতজন,সবাই মিলেমিশে খোঁজখবর নেয়। এই খোঁজখবরের মধ্যেই ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে বর-কনের গুণাগুণ, যোগ্যতা, সীমাবদ্ধতা, এমনকি দুর্বলতাও। সবকিছু যাচাই-বাছাই শেষে যদি উভয় পক্ষ সন্তুষ্ট হয়, তবেই বিয়ের পরবর্তী কার্যক্রমে এগিয়ে যায়।
ঠিক একইভাবে নির্বাচনের সময় যখন কোনো ব্যক্তি প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ান, তখন ভোটাররাও তার আমলনামা খোঁজেন। তার অতীত, চরিত্র, সামাজিক ভূমিকা, সততা, কাজের দক্ষতা,সবকিছুই আলোচনায় আসে। এটি খোঁজা উচিত বলেই আমি মনে করি। কারণ একজন জনপ্রতিনিধি শুধু ব্যক্তি নন, তিনি হাজারো মানুষের আশা-ভরসার প্রতীক।
তবে আমাদের একটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি-মানুষ মাত্রই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। ভুল করা স্বাভাবিক। কেউ ভুল করে জেনে, কেউ না জেনে। কেউ আবার ভুল করে পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে সংশোধনের চেষ্টা করে। আমরাও প্রতিদিনের জীবনে ছোট-বড় নানা ভুল করে থাকি। এই ভুলগুলো অনেক সময় সামনে আসে ঠিক দুইটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে-বিয়ে এবং নির্বাচন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এমন একদল মানুষ আছেন যারা এই সময়টাকেই বেছে নেন অন্যের ভুলগুলো জনসম্মুখে তুলে ধরার জন্য। যেন বিয়ের সময় বর-কনেকে অথবা নির্বাচনের সময় প্রার্থীকে কীভাবে হেয় করা যায়, কীভাবে ছোট করা যায়-এই চিন্তাতেই তারা বেশি মশগুল থাকেন। হুজুগে পড়ে যাচাই-বাছাই ছাড়াই অভিযোগ ছড়ানো, কটূক্তি করা বা অপমান করাকে তারা যেন দায়িত্ব মনে করেন।
যেহেতু বর্তমানে নির্বাচনের মৌসুম চলছে, তাই বিয়ের প্রসঙ্গ থেকে সরে এসে একটু নির্বাচন নিয়েই কথা বলি। ইদানীং লক্ষ্য করছি, নির্বাচনী প্রচারণায় নিজ প্রার্থীর গুণাবলি, যোগ্যতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করা হচ্ছে প্রতিপক্ষকে হেয় করার পেছনে। কে কত খারাপ, কার চরিত্র কেমন, কে ক্ষমতায় গেলে কিছুই করতে পারবে না-এই ধরনের বক্তব্যেই ভরে যাচ্ছে অনেক নির্বাচনী মঞ্চ।
আর দুঃখের বিষয় হলো, এসব নেতিবাচক প্রচারণায় অনেক সময় তথাকথিত সচেতন মানুষদের অংশগ্রহণই বেশি দেখা যায়। প্রায়ই স্টেজে বক্তৃতায় শুনি-অমুক প্রার্থীর চরিত্র এমন, তমুক প্রার্থী নির্বাচিত হলে কিছুই করতে পারবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতে সাধারণ ভোটার কী পেল? এতে কি রাজনীতির মান উন্নত হলো?
আপনি যদি সত্যিই আপনার প্রার্থীকে এগিয়ে নিতে চান, তাহলে তার কাজ, তার চিন্তা, তার পরিকল্পনা, তার সততা ও দক্ষতার কথা বলুন। মানুষকে আশাবাদী করুন। ইতিবাচক ও কৌশলী বক্তব্যের মাধ্যমে ভোটারদের আস্থা অর্জন করুন। অন্যকে হেয় করে কখনোই নিজের অবস্থান শক্ত করা যায় না।
ইসলাম ধর্মও কাউকে হেয় করা, দোষ প্রচার করাকে কখনোই সমর্থন করে না। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন-“যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোনো মুসলমানের দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।”
(সহিহ মুসলিম, সহিহ বুখারি)
এই হাদিস আমাদের শুধু ব্যক্তিগত জীবনেই নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনেও বড় শিক্ষা দেয়। একজন মানুষের ভুল থাকতেই পারে, কিন্তু তা নিয়ে তাকে অপমান করা, চরিত্রহনন করা কখনোই নৈতিক বা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য নয়।
সবশেষে বলতে চাই, নির্বাচন হোক কিংবা বিয়ে দুটোই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই সময়টায় দায়িত্বশীল আচরণ, পরিমিত ভাষা ও ইতিবাচক মনোভাবই সমাজকে এগিয়ে নিতে পারে। আসুন, আমরা সমালোচনা নয়-যোগ্যতা খুঁজি; হেয় নয়-হোক শালীনতা; বিভাজন নয়-হোক সুস্থ প্রতিযোগিতা। তবেই একটি সুন্দর, মানবিক ও নৈতিক সমাজ গড়ে উঠবে।
লেখক : সম্পাদক, কানাইঘাট নিউজ ডটকম ও সাধারণ সম্পাদক, কানাইঘাট প্রেসক্লাব

0 comments:
পাঠকের মতামতের জন্য কানাইঘাট নিউজ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়