এহসানুল হক জসীম::
লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা কানাইঘাট উপজেলার ১ নং লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের কেওটি হাওর যেমন রূপলাবণ্যে অনন্য, তেমনি সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা ধারণ করে। সত্যিই প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের এক অনন্য আধার। গত ১২ এপ্রিল সরেজমিনে গিয়ে যে উপলব্ধি-- পাহাড়ের পাদদেশ ঘেঁষে অবস্থিত এই হাওর অঞ্চলটি তার অনিন্দ্য সুন্দর রূপ দিয়ে পর্যটকদের মুগ্ধ করবে যদি এলাকাটিকে পর্যটক বান্ধব হিসেবে গড়ে তুলা যায়।
একটি পাহাড়ি এলাকা। পাহাড়ে কি হাওর থাকে? এই যে পাহাড়ে হাওরের অস্তিত্ব-- এটা একটা বৈচিত্র নয় কি? সেই হাওরের বিস্তীর্ণ জমিতে বোরো চাষ হয়। অন্যান্য ফসলও হয়। আর এটি কেবল হাওর নয়। পাহাড়বেষ্টিত এলাকায় হাওর, আর সেই হাওরের মাঝখানে আবার টিলা বা পাহাড়। অর্থাৎ পাহাড়ে হাওর, আর হাওরের মাঝে পাহাড়। যখন পানিতে পুরো হাওর ডুবে যায় তখন টিলাগুলো বা টিলার উপর বাড়িগুলো ভেসে উঠে। খুবই সুন্দর দেখায়।
সিলেটের পর্যটন এলাকা বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে জাফলং, লালাখাল, বিছানাকান্দি কিংবা রাতারগুলের ছবি। কিন্তু কানাইঘাট উপজেলার ১ নং লক্ষীপ্রসাদ পুর্ব ইউনিয়নের কয়েকটি স্থান এখনো রয়ে আছে দৃষ্টির বাইরে। কেওটি হাওর এমন এক লুকানো এলাকা। বাইরের পর্যটক দুরে থাক, উপজেলার অন্য এলাকার লোকজনের কাছেও কেওটি হাওর অপরিচত-অজানা। অথচ এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ভূ-তাত্ত্বিক গুরুত্ব যেকোনো জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রকে টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
কেওটি হাওরের আসল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে বর্ষাকালে। যখন বৃষ্টির পানিতে হাওর কানায় কানায় পূর্ণ হয়, তখন নীল আকাশের মেঘের প্রতিচ্ছবি স্থির স্বচ্ছ পানিতে এক অপার্থিব দৃশ্যের অবতারণা করে। হাওরের বুক চিরে জেগে থাকা ছোট ছোট টিলা এবং সেই টিলার ওপর সবুজ গাছের ছায়া একে দেয় এক ভিন্ন মাত্রা। বিকেলের শান্ত রোদে টিলার ছায়া যখন পানিতে পড়ে, তখন মনে হয় কোনো দক্ষ শিল্পী জলরঙ দিয়ে এক মায়াবী ছবি এঁকে রেখেছেন। এখানে পাহাড়, পানি আর সবুজের এমন মিতালি দেখা যায়, যা সচরাচর অন্য কোথাও মেলে না। আবার শুষ্ক মৌসুমে বিস্তীর্ণ সবুজ ফসলের মাঠ—ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে কেওটি হাওর তার রূপ বদলায়। দিগন্তজোড়া সবুজ পাহাড় আর হাওরের শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশ সৌন্দর্যপিয়াসীদের এক নিমেষে মুগ্ধ করতে বাধ্য।
কেওটি হাওর শুধু সৌন্দর্যের আধার নয়, হাওরের মধ্যকার বিভিন্ন টিলায় প্রচুর কাঁঠাল উৎপাদন হয়। এই হাওরের মধ্যে একটি গ্রাম কেরকেরিপাড়া। এই গ্রামের টিলায় ও বিভিন্ন বাড়িতে প্রচুর কাঁঠালের গাছ দেখা গেছে। গাছে প্রচুর কাঁঠাল এসেছে। এই গ্রামের বাসিন্দা প্রবাসী আব্দুল্লাহ বলেন, এখানে যে পরিমাণ কাঁঠাল উৎপাদন হয়, সেই কাঁঠাল স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে আশপাশ এলাকায় যায়। তবে যাতায়াতের সংকটের কারণে কাঁঠাল বেশি সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। উপযুক্ত দামও পাওয়া যায় না। প্রচুর আমও উৎপাদন হয় বলে জানালেন আব্দুল্লাহ। বিভিন্ন টিলা ঘুরে আব্দুল্লাহর এসব কথার বাস্তবতা দেখা গেছে।
কেওটি হাওরে বিভিন্ন বণ্যপ্রাণীর বাস রয়েছে। বণ্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য যেখানে সরকার নানা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, সেখানে এই হাওরের টিলায় হরিণ, শুকর-সহ বিভিন্ন বণ্যপ্রাণী বাস করে। আমরা যখন সরেজমিন সেথায় ছিলাম, তখন দেখলাম লোভা চা বাগান এলাকার বেশ কিছু লোক একটি বড় টিলার আশেপাশে দেশী এক প্রকার অস্ত্র নিয়ে ঘুরাঘুরি করছে। হাওরের পার্শ্ববর্তী উজান বারাপৈত গ্রামের ইফতেখার চৌধুরী বললেন, উনারা মূলত লোভছাড়া চা বাগান এরিয়ার চা শ্রমিক। শুকর তাদের অনেকের পছন্দের খাবার। মাঝে মাঝে তারা দল বেঁধে এই এলাকায় আসেন শুকর শিকার করতে। কেরকেরিপাড়ার আব্দুল্লাহ জানালেন, মাঝে মাঝে হরিণের দেখা মেলে তাদের এলাকায়।
গাছপালা ও ফলমূলের পাশাপাশি কেওটি হাওর স্থানীয় মৎস্য ও কৃষি অর্থনীতির জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান হতে পারে। এখানে বোরোসহ ধান চাষ হয়। সেই ধানের জমিতে আবার প্রচুর পরিমাণ মাছ থাকে। হাওরের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন খাল প্রবাহিত হয়েছে। খালগুলোতে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। ১ নং লক্ষীপ্রসাদ পুর্ব ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার নাজিম উদ্দিন জানালেন, সীমান্তবর্তী দনা নদী থেকে পাহাড়ি এলাকার মধ্য দিয়ে একটি খাল কেওটি হাওরের দিকে প্রবাহিত হয়েছে। আগে এই খালে প্রচুর পানি ছিলো। নৌকাও চলতো। এখন খালটি ভরাট হওয়ার পথে। এই খালটিকে যদি পুনরজ্জীবিত করা যায় তথা খনন করে খালটির প্রবাহ যদি ঠিক হয় তাহলে কেওটি হাওরে আরো হাজার হাজার বিঘা জমিতে ধান উৎপাদন হবে। হাওরটি তখন আরো সমৃদ্ধ হবে।
তবে এই হাওরের আকর্ষণ শুধু তার নান্দনিক সৌন্দর্যে কিংবা মৎস্য ও কৃষি অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কেওটি হাওর কেবল তার দৃশ্যপট দিয়েই মুগ্ধ করে না, বরং এটি একটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ক্ষেত্রও বটে। এই অঞ্চলটি ভূ-তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার একটি নতুন দুয়ার উন্মোচন করতে পারে যদি সেভাবে পরিকল্পনা নিয়ে আগানো যায়। স্থানীয়দের কারো কারো মতে, কেওটি হাওর এলাকায় চীনামাটির (Kaolin) আছে। হাওরের পাশ্ববর্তী এলাকা ভাটি বারাপৈতের বাসিন্দা এবং ইউপি মেম্বার কোহিনুর আহমদ বলেন, এখানে চীনামাটি থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো উচিত বলে তিনি মনে করেন। সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ডা. ফয়েজ আহমদের মতে, অপার সম্ভাবনার কেওটি হাওর পর্যটনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনারও হাতছানি দিচ্ছে। প্রয়োজন এই হাওরকে নিয়ে যথাযথ পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ।
সংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চলের মাটির গঠন ও প্রকৃতি এই সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করে। সরেজমিন যা দেখা গেলো তাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুরের বিরিশিরি এলাকার সাথে কিছুটা মিল পাওয়া গেছে। সেখানে চীনামাটি পাওয়া যায়। কেওটি হাওরের মাটি বা টিলার গঠন প্রকৃতি ওই জায়গার মতো। কেওটি হাওর থেকে কিছু মাটি ব্যাগে করে ঢাকায় নিয়ে এসেছি। যদি সরকারি উদ্যোগে এখানে খনিজ অনুসন্ধান চালানো হয়, তবে এটি দেশের সিরামিক শিল্পের জন্য একটি বড় শক্তির উৎস হয়ে উঠতে পারে। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যদি এমনটি প্রমাণিত হয়, তাহলে সেটা সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
চীনামাটি বিভিন্ন শিল্পে অপরিহার্য। বিশেষ করে সিরামিক, কাগজ, রং, রাবার এবং প্রসাধনী শিল্পে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। যদি এই অঞ্চলে পর্যাপ্ত পরিমাণে ও মানসম্পন্ন চীনা মাটির মজুদ নিশ্চিত করা যায়, তবে এটি কেবল স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার করবে না, বরং জাতীয় পর্যায়েও ভূমিকা রাখবে। পরিকল্পিত খনন ও প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে উঠলে এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।
এত সম্ভাবনা ও অনিন্দ্য সুন্দর প্রকৃতি থাকা সত্ত্বেও কেওটি হাওর আড়ালে রয়ে গেছে অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও দুর্গম এলাকায় হওয়ার কারণে। কানাইঘাট উপজেলা সদর কিংবা উপজেলার অন্য যে কোন এলাকা থেকে ১ নং লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের এই দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো যে কারো জন্য বেশ কষ্টসাধ্য। রাস্তাঘাটের বেহাল দশা এবং যানবাহন না থাকায় উপজেলা বা দেশের অন্যান্য প্রান্তের মানুষ আসা দুরে থাক, এই ইউনিয়নেরও অনেকের আসার সুযোগ কম। কেওটি হাওর বা পুরো ইউনিয়নে আজো গাড়ির চাকা ঘুরেনি।
সিলেট শহর থেকে আনুমানিক ৫০ কিলোমিটার দুরের কেওটি হাওরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে আমরা সিলেট শহর থেকে জকিগঞ্জ রোড ধরে রওয়ানা হই। সড়কের বাজারের একটু আগে সাতবাঁক ঈদগাহে বা হারিছ চৌধুরীর কবরের পাশে নামি। ওখান থেকে আনুমানিক এক কিলোমিটার পথ ধরে অটোরিক্সায় দিঘীরপার খেয়াঘাট গিয়ে খেয়া নৌকায় সুরমা নদী পার হয়ে উজান বারাপৈত গ্রাম। এই গ্রামের ইফতেখার চৌধুরীর সহযোগিতায় বাইকযোগে আরো প্রায় তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কেওটি হাওর যাই। ওখানে কেরকেরিপাড়া গ্রামে একটা মসজিদ পাই, মসজিদের সাথে একটা নতুন মাদ্রাসাও হয়েছে। সিলেট-জকিগঞ্জ রোডে সড়কের বাজার নেমে সেখান থেকে হারিছ চৌধুরীর বাড়ির ঠিক বিপরীতে অবস্থিত মমতাজগঞ্জ বাজার হয়েও কেওটি হাওর যাওয়া যায়।
সঠিক পরিকল্পনা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে কেওটি হাওর যেমন পর্যটকদের তৃষ্ণা মেটাবে, তেমনি স্থানীয় অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। প্রকৃতি যেখানে দুহাত ভরে সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে, সেখানে মানুষের একটু সহযোগিতা আর উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলে কেওটি হাওর হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা পর্যটন গন্তব্য। কেওটি হাওর একদিকে যেমন প্রকৃতির এক অমূল্য দান, অন্যদিকে এটি খনিজ সম্পদের এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা। পর্যটন বিকাশের পাশাপাশি ভূ-তাত্ত্বিক এই সম্পদের সঠিক ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে কেওটি হাওর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক নতুন মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে।
লেখক: চেয়ারম্যান, কানাইঘাট গণশিক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশন
0 comments:
পাঠকের মতামতের জন্য কানাইঘাট নিউজ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়