Thursday, May 30

ইতেকাফের মাসআলাসমূহ

 শহীদুল ইসলাম::

মাসআলা : ইতেকাফের জন্য জরুরী বিষয় তিনটি-

(এক) ইতেকাফের জন্য পুরুষের এমন মসজিদে অবস্থান করা, যেখানে নামাজের জামাত হয়। 
(দুই) ইতেকাফের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করা। নিয়ত ছাড়া যদি কেউ মসজিদে অবস্থান করে তাহলে যত নেক আমলই করুক না কেন ইতেকাফের সওয়াব লাভ হবে না।
উল্লেখ, শরীয়তে কারো নিয়ত শুদ্ধ হওয়ার জন্য যেহেতু নিয়তকারী মুসলমান ও জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া শর্ত তাই নিয়তের মধ্যে এই দুটি শর্তও উহ্য রয়েছে। অর্থাৎ ইতেকাফকারী মুসলমান ও জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া। তবে বালেগ হওয়া শর্ত নয়। বিধায় কোনো জ্ঞানসম্পন্ন নাবালেগ যদি ইতেকাফে বসে তাহলে তার ইতেকাফ শুদ্ধ হবে।
(তিন) হায়েজ তথা ঋতুস্রাব ও নেফাস তথা বাচ্চা জন্মের পর মায়ের বাচ্চাদানী থেকে যে রক্ত বের হয় তা থেকে পবিত্র হওয়া। এমনিভাবে ফরজ গোসল থাকলে তা থেকে পাক হওয়া। (দুররে মুখতার)
ইতেকাফের জন্য সর্বোত্তম জায়গা: মাসআলা : ইতেকাফের জন্য উত্তম ও পর্যায়ক্রমে নিম্নে স্থানের বর্ণনা। ইতেকাফের জন্য সর্বোত্তম স্থান হলো কা’বা শরীফের মসজিদে হারাম। তারপর মসজিদে নববী ও তারপর মসজিদে আকসা তথা বাইতুল মুকাদ্দাস। তারপর এমন জামে মসজিদ যেখানে জামাতে নামাজ পড়ার সুব্যবস্থা আছে। যদি জামে মসজিদে জামাতের ব্যবস্থা না থাকে তাহলে মহল্লার মসজিদ। তারপর যে মসজিদে নামাজের জামাত বড় হয়। (রদ্দুল মুহতার)
উল্লেখ, মসজিদে হারামে বা মসজিদে নববীতে ইতেকাফ সবচেয়ে বেশি ফজিলতপূর্ণ বলা হয়েছে। এজন্য সারা দুনিয়া থেকে আল্লাহপ্রেমীরা রমজান মাসে উমরার জন্য এসে এই দুস্থানে ইতেকাফ করে। আমাদের যাদের সামর্থ্য আছে আমরাও চেষ্টা করি রমজানে উমরা করে মসজিদে নববী বা হারামে ইতেকাফ করার জন্য।
ইতেকাফে রোজা থাকা বা না থাকা ও ইতেকাফের প্রকার: (এক) ওয়াজিব ইতেকাফ। এটা আবার দু,ভাবে হতে পারে। (ক) শর্তযুক্ত যেমন কেউ বলে আমি যদি ওমুক বিপদ থেকে মুক্তি পাই তাহলে এত দিন রোজা রাখবো। (খ) শর্তহীন যেমন কেউ বললো আল্লার জন্য আমি তিন দিন ইতেকাফ করবো। ওয়াজিব ইতেকাফের জন্য রোজা শর্ত। যখন ইতেকাফ করবে তখনই রোজা রাখতে হবে। বরং ওয়াজিব ইতেকাফে কেউ যদি নিয়ত করে আমি রোজা ছাড়া শুধু ইতেকাফের মানত করছি তাহলেও তাকে রোজা রাখতে হবে। সুতরাং কেবল রাতে ইতেকাফের নিয়ত করলে নিয়ত গ্রহণযোগ্য হবে না। কেননা রাতে রোজা হয় না।
(দুই) সুন্নত ইতেকাফ। রমজানের শেষ দশকের ইতেকাফ হলো সুন্নতে মুয়াক্কাদা আলাল কিফায়া।
মাসয়ালা: সুন্নত ইতেকাফ যেহেতু রোজার সময় হয় তাই এখানে পৃথকভাবে রোজার শর্তের প্রয়োজন নেই।
ইতেকাফের সময় সংক্রান্ত মাসায়ালা: ওয়াজিব ইতেকাফ কমপক্ষে একদিন হতে হবে। আর বেশি যত দিনের মানত করা হবে ততদিন হবে। সুন্নত ইতেকাফ রমজানের শেষ দশ দিন। মুস্তাহাব ইতেকাফের কোনো সময় নির্ধারিত নেই। এক মিনিটের নিয়তে মসজিদে প্রবেশ করলে তাও ইতেকাফ হবে।
ইতেকাফে নিষিদ্ধ যে সকল কাজ: ইতেকাফ অবস্থায় নিম্নে উল্লেখিত দু’ধরনের কাজ করা হারাম। অর্থাৎ, এ দুই কাজ করলে ওয়াজিব ও সুন্নত ইতেকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। এবং পরবর্তীতে এর কাযা করতে হবে। আর মুস্তাহাব ইতেকাফে এ সকল কাজ করলে ইতেকাফ নষ্ট হয়ে যাবে এবং পরবর্তীতে এর কাযা করা লাগবে না।
প্রথম প্রকার হারাম কাজ: ইতেকাফের স্থান থেকে স্বাভাবিক বা শরয়ী প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হওয়া। স্বাভাবিক প্রয়োজন যেমন প্রস্রাব-পায়খানা, ফরজ গোসল ও খাবার আনার লোক না থাকলে খাবার আনতে যাওয়া ইত্যাদি। শরয়ী প্রয়োজন যেমন জুমার নামাজের জন্য বের হওয়া।
মাসআলা: যে প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হওয়ার অনুমতি আছে, কাজ শেষ করে সেখানে আর অবস্থান করবে না। যথাসম্ভব মসজিদের কাছে প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করবে। যেমন পায়খানার ব্যবস্থা নিজের বাড়ীতে আছে আবার মসজিদের পাশে বন্ধুর বাসায়ও আছে। এখানে সে পায়খানার জন্য নিজ বাড়ীতে যাবে না বরং বন্ধুর বাসায় পায়খানা করবে। তবে কারো যদি নিজের বাড়ীর পায়খানা ব্যতিত প্রয়োজন পূর্ণ না হয় তাহলে নিজ বাড়ীতে যেতে কোনো সমস্যা নেই।
মাসআলা: জুমার জন্য নিজ মসজিদ থেকে অন্য কোথাও যেতে হলে এমন সময় বের হবে, যাতে ওই মসজিদে গিয়ে তাহিয়্যাতুল মসজিদ ও জুমার পূর্বের চার রাকাত সুন্নত আদায় করতে পারে। ফরজ আদায়ের পর জুমার সুন্নত আদায়ের জন্য বিলম্ব করা জায়েজ আছে।
মাসআলা: সাধারণত যে সকল প্রয়োজনের সম্মুক্ষিণ মানুষের হতে হয় না, তার জন্য ইতেকাফের স্থান ছেড়ে দেয়া ইতেকাফ পরিপন্থি। যেমন কোনো রোগীকে দেখতে যাওয়া।
দ্বিতীয় প্রকার হারাম কাজ: ওই কাজগুলো, যা ইতেকাফ অবস্থায় করা নাজায়েজ। যেমন সহবাস করা। ইচ্ছায়, অনিচ্ছায় সব সুরতের হুকুম এক। সহবাসের আনুসাঙ্গিক কাজ যেমন চুম্বন করা, আলিঙ্গন করাও ইতেকাফ অবস্থায় নাজায়েজ। সহবাসের আনুসাঙ্গিক কাজগুলো নাজায়েজ হলেও যদি বীর্জপাত না হয় তাহলে ইতেকাফ নষ্ট হবে না।
ইতেকাফে বসে কেনাবেচার বিধান: ইতেকাফে বসে বিনা প্রয়োজনে দুনিয়াবী কাজে লিপ্ত হওয়া মাকরুহে তাহরীমি। যেমন বিনা প্রয়োজনে কেনাবেচা বা ব্যবসা সংক্রান্ত কোনো কাজ করা। তবে কোনো কাজ অবশ্য করণীয় হলে ভিন্ন কথা। যেমন ঘরে কোনো খাবার নেই। আবার ক্রয় করে দিবে এমন কোনো বিশ্বাসী লোকও নেই। তাহলে এমতাবস্থায় কোনো বস্তু ক্রয় করা জায়েজ। তবে মালপত্র মসজিদে আনা কোনো অবস্থাতেই জায়েজ নেই। তবে মালপত্র মসজিদে আনলে যদি মসজিদ নষ্ট হওয়া বা আবদ্ধ হওয়ার কোনো আশংকা না থাকে তাহলে কোনো কোনো ফকিহ পণ্য মসজিদে এনে ক্রয়-বিক্রয় জায়েজের পক্ষে মত দিয়েছেন।  (বেহেশতি জেওর)
ইতেকাফে বসে আমলে রত থাকা: ইতেকাফে বসে (সওয়াব মনে করে) একেবারে চুপ করে বসে থাকা মাকরুহে তাহরীমি। তবে সাবধান! ইতেকাফে বসে গল্প গুজব চলবে না। খারাপ বা মিথ্যা কথা বলা যাবে না। কারো গীবত শেকায়েত করা যাবে না। বরং সব সময় জিকির আজকার, কোরআন তেলাওয়াত, তওবা ও দোয়া ইস্তেগফারে লিপ্ত থাকা চাই। মোটকথা চুপ করে বসে থাকা ইবাদত নয়। আবার গীবত শেকায়াত করাও উচিত নয়।
ইতেকাফের সময়কে গনিমত মনে করে, নিজের দ্বীনি জ্ঞানকে সমৃদ্ধের কাজে লাগানো উচিত। এ জন্য সাধারণ যারা, তারা নবীগণের শিক্ষনীয় ঘটনা, সাহাবায়ে কেরাম ও ওলি আউলিয়াদের জীবনচরিত অধ্যয়ন করা চাই। দ্বীনের বিধিবিধান সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান শূন্যে তাই এই বিষয়েও উলামায়ে কেরামের পরামর্শে অধ্যয়ন হতে পারে। রমজান কোরআন নাজিলের মাস। যারা সহীহ শুদ্ধভাবে কোরআন তেলাওয়াতে সক্ষম নই, এই ইতেকাফের সময়কে কাজে লাগিয়ে সহীহ শুদ্ধভাবে কোরআন তেলাওয়াত শিখতে পারি। মনে রাখতে হবে শেখার কোনো বয়স নেই। আর কেউ কারো কাছে শিখতে গেলে সে ছোট হয়ে যায় না। তাই আমাদের সকল ধরনের সংকোচবোধ ঝেড়ে ফেলে দ্বীনের শিক্ষা লাভের জন্য লেগে যাওয়া উচিত।
বিড়ি-সিগেরেট খেতেই হলে করণীয়: পূর্বে আলোচনা হয়েছে মানুষ তার কিছু প্রয়োজনে মসজিদের বাইরে বের হতে পারবে। এর মধ্যে কিছু মানবীয় প্রয়োজন আর কিছু হচ্ছে শরয়ী প্রয়োজন। কারো কারো দাবী হচ্ছে, যারা বিড়ি, সিগেরেট, হুক্কা ইত্যাদি না খেয়ে থাকতে পারেন না, তাদের এটা মানবীয় প্রয়োজন। তাই তাদের জন্য করণীয় হচ্ছে, মসজিদের বাইরে গিয়ে এগুলো খাবে এবং দ্রুত মেসওয়াক ইত্যাদির মাধ্যমে মুখ থেকে দুর্গন্ধ দূর করে মসজিদে ফিরে আসবে। (খালেদ সাইফুল্লাহ রাহমানি, কামুসূল ফিকহ, খন্ড-২, পৃষ্ঠা-১৭৩) 
রমজান মাসে অনেকে মসজিদে ইফতার করেন। এর মধ্যে ইতেকাফকারী ছাড়া বাইরের মুসল্লিরাও থাকেন। হাদিসে দুর্গন্ধ জাতীয় বস্তু খেয়ে মসজিদে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। দুর্গন্ধ জাতীয় বস্তুর মধ্যে, পেয়াজ, রসুনও শামিল। তাই যারা মসজিদে ইতেকাফ করি তারা উক্ত বিষয়ের প্রতি যত্নবান হই।
কোনো কারণে মসজিদ পাল্টাতে হলে: কোনো ইতেকাফকারীকে জোরপূর্বক মসজিদ থেকে বের করে দেয়া হলে, কিংবা মসজিদ ধ্বসে যাওয়ার কারণে বাধ্য হয়ে বের হয়ে যেতে হলে অথবা যে মসজিদে ইতেকাফে বসেছে ওই মসজিদে যদি শত্রুর কারণে জান-মালের ব্যাপারে আশঙ্কা তৈরি হলে অন্য মসজিদে গিয়ে ইতেকাফে বসা বৈধ হবে। এতে ইতেকাফের কোনো সমস্যা হবে না। তবে শর্ত হচ্ছে, তাৎক্ষণিক দ্বিতীয় মসজিদে গিয়ে ইতেকাফে বসে যেতে হবে। আর যদি বিলম্ব হয় তাহলে ইতেকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। (খালেদ সাইফুল্লাহ রাহমানি, কামুসূল ফিকহ, খন্ড-২, পৃষ্ঠা-১৭৩) 
‘আল্লাহ না করুন’ কোনো মসজিদ যদি দুর্ঘটনার শিকার হয়ে তাতে ইতেকাফে বসার উপযুক্ত না হয়, কিন্তু কিছু মুসল্লি আগে থেকেই ইতেকাফে ছিলো তাহলে তাদের করণীয় হচ্ছে তাৎক্ষণিক মহল্লার অন্য মসজিদে গিয়ে ইতেকাফে বসা। অন্যথায় ইতেকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। সুন্নত ইতেকাফ হলে ওই দিনের ইতেকাফ পরবর্তীতে কাযা করবে।
 
অসুস্থতার কারণে ইতেকাফ ভেঙ্গে ফেলা: অসুস্থতা এবং এর চিকিৎসা এমন প্রয়োজন, যার দরুন ইতেকাফ ভেঙ্গে ফেলা জায়েজ আছে। কিন্তু সুন্নত ইতেকাফ হলে একদিনের ইতেকাফ পরবর্তীতে কাযা করতে হবে। (ফতোয়ায়ে উসমানী, খন্ড-২, পৃষ্ঠা-১৯৫)
ইতেকাফে গোসলের বিধান: মসজিদের সঙ্গে লাগানো গোসলখানা, যা মসজিদের অন্তর্ভূক্ত নয় তাতেও জুমার গোসল বা পরিচ্ছন্নতার গোসলের জন্য যাওয়া জায়েজ নেই। ইতেকাফে বসে গোসল করতে হলে মসজিদে কোনো টপ বসিয়ে তাতে গোসল করবে। বা মসজিদের কিনারায় বসে এমনভাবে গোসল করবে যেন ব্যবহৃত পানি মসজিদে না আসে তাহলে জায়েজ। (ফতোয়ায়ে উসমানি, খন্ড-২, পৃষ্ঠা-১৯৬) কোনো কোনো আলেমের পরামর্শ হচ্ছে, যারা গোসল না করে থাকতে পারে না, তারা মানবীয় প্রয়োজনে বের হওয়ার সময় লুঙ্গি গামছা সঙ্গে নিয়ে বের হবেন। তারপর প্রয়োজন সেরে আসার সময় দ্রুত শরীরে পানি দিয়ে গোসল করে নিবেন।

শেয়ার করুন

0 comments:

পাঠকের মতামতের জন্য কানাইঘাট নিউজ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়

নোটিশ :   কানাইঘাট নিউজ ডটকমে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক