Thursday, June 1

মোরার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্তরা খাদ্য সংকটে

মোরার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্তরা খাদ্য সংকটে

কানাইঘাট নিউজ ডেস্ক: ঘূর্ণিঝড় মোরার তাণ্ডবে কক্সবাজারের ঘরহারা মানুষগুলো এখন খাদ্য সংকটে পড়েছে।

সেন্টমার্টিন দ্বীপের পূর্বপাড়া গ্রামের ক্ষুদ্র মাছ ব্যবসায়ী আবু তালেবের বাড়ির কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট রাখেনি 'মোরা'। রান্নাঘরের সরঞ্জামগুলোও খোঁজে পাওয়া যায়নি। পরিবারের সাত সদস্য নিয়ে এখন খাবার সংকটে পড়েছেন আবু তালেব।

দ্বীপের বাজারপাড়া গ্রামের আবদুর রহমান একটি চা দোকান দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন। তার একমাত্র সম্বল সেই দোকানটি আর নেই। ঝড়ে উড়িয়ে নিয়ে গেছে ছনের ছাউনি দেওয়া বসতঘরটিও। তিনি এখন জেটি ঘাটে অপেক্ষা করছেন নৌবাহিনীর জাহাজের। ত্রাণসামগ্রী নিয়ে এসেছে নৌবাহিনীর একটি জাহাজ।

দ্বীপের ডেইলপাড়া গ্রামের মোরতুজার বড়শি বোটটি ছিল তার জীবিকার একমাত্র সম্বল। ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত পেয়ে নৌকাটি ঘাটে বেঁধে রেখে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়েছিলেন মোরতুজা। গতকাল বিকেলে ঘাটে গিয়ে দেখেন নৌকার কিছু কাঠ পড়ে রয়েছে তীরে। ঘূর্ণিঝড় ভেঙে ফেলেছে এটি। একইভাবে বোট হারিয়েছেন পূর্বপাড়ার কবির আহমদ, বাজারপাড়ার নোমানসহ আরও কয়েকজন।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুর আহাম্মদ জানান, দ্বীপে সাড়ে ৪'শ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ১২ হাজার লোকসংখ্যার এই দ্বীপের প্রায় সবাই আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বাড়ি ফিরে তাদের অনেকে বসতঘরের আর দেখা পাননি। তিনি জানান, দ্বীপের বেশির ভাগ মানুষ মৎস্যজীবী। তাদের অর্ধশত নৌকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গতকাল বিকেলে চেয়ারম্যান জানান, নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে ৫'শ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হয়েছে। পরিবার প্রতি দেওয়া হয়েছে ২ কেজি মুড়ি, ২ কেজি চিড়া, এক কেজি করে ছোলা এবং পানির একটি বোতল। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য খাদ্য সংকট প্রকট হয়ে পড়েছে। সেইসঙ্গে তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই দরকার বলে জানান চেয়ারম্যান।

'মোরা'র তাণ্ডবে টেকনাফ উপজেলায় পাঁচ হাজারের বেশি ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে শাহপরীর দ্বীপে। এখানে অধিকাংশ ঘরবাড়ির টিন ও ছাউনি উপড়ে পড়েছে।

শাহপরীর দ্বীপের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক জসিম মাহমুদ জানান, এখানে খাবারের সংকট তীব্র। গতকাল বুধবার বিকেল পর্যন্ত ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি এলাকায়।

সাবরাং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুর হোসেন জানান, শাহপরীর দ্বীপে হাজারখানেক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তরা এখন আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন, কেউ উঠেছেন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে। তাদের জন্য এখন খাদ্যসামগ্রীর প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন সিদ্দিক বলেন, উপজেলায় প্রাথমিকভাবে সাড়ে চার হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। তিনি জানান, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের নিজ নিজ এলাকার ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

টেকনাফ পৌরসভার নুর আয়েশা বেগম ছনের ছাউনির একটি ছোট ঘরে বসবাস করতেন। 'তুফান' তার সেই ছোট ঘরটা তছনছ করে দিয়ে গেছে। তিনি বলেন, 'এখন বৃষ্টির চেয়ে সূর্যের তেজ বেশি লাগে। সকাল থেকে না খেয়ে আছি। শূন্য ভিটায় প্রচণ্ড গরমে পুড়ে যাচ্ছি। রিলিফের সন্ধানে যাব সেই শক্তিও নেই।'

টেকনাফ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহাজান মিয়া বলেন, 'আমার এলাকায় এক হাজারের বেশি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ এখনও আশ্রয়কেন্দ্র ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে রয়েছেন। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পরিবারপ্রতি ১০ কেজি করে চাল বরাদ্দ হয়েছে। তা মোটেই পর্যাপ্ত নয়। তিনি বলেন, সামনে বর্ষা, এই মুহূর্তে প্রয়োজন মাথা গোঁজার ঠাঁই।

টেকনাফের মতো কক্সবাজারের উপকূলীয় উপজেলা মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, পেকুয়া এবং কক্সবাজার সদরের বেশির ভাগ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চকরিয়া উপজেলায় এক হাজার ২৯৩টি বসতবাড়ি সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। মঙ্গলবার ঘূর্ণিঝড়ে গাছ চাপা পড়ে পূর্ব বড় ভেওলা সিকদারপাড়া গ্রামের নিহত ছাইরা খাতুন (৬০) ও ডুলাহাজারা ইউনিয়নের পূর্ব ডুমখালী গ্রামের রহমত উল্লাহর (৪০) দাফন গতকাল সম্পন্ন হয়েছে। তবে তাদের পরিবারের অভিযোগ, সরকারিভাবে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা এখনও তারা পাননি। বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে বলে জানান চকরিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা।

জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানিয়েছেন, প্রাথমিক যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে জেলায় ২৭ হাজার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৫ হাজার ৫১৬টি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৫২ হাজার। গৃহহারা এসব লোকজনের জন্য মঙ্গলবার ১২৫ টন চাল, সাড়ে ৯ লাখ টাকা এবং ৭০০ প্যাকেট খাবার বরাদ্দ করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে এই চাল, অর্থ ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণের কাজ শুরু হয়েছে। এ ছাড়া গতকাল বুধবার আরও ১৩২ টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য। ঘূর্ণিঝড়ে গাছ চাপা পড়ে এবং টিনের আঘাতে জেলায় নিহত হয়েছেন চারজন।

জেলা প্রশাসক জানান, আশ্রয়কেন্দ্রে আসা প্রায় দুই লাখের বেশি লোক তাদের বাড়িঘরে ফিরে গেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়িঘর নির্মাণেও সরকারিভাবে সাহায্য করা হবে। তিনি জানান, ৩০০ বান্ডেল টিন বরাদ্দ পাওয়া গেছে মন্ত্রণালয় থেকে।

এদিকে গতকাল বুধবারের মধ্যে জেলার অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। তবে চকরিয়া এবং পেকুয়া উপজেলায় বেশির ভাগ এলাকায় এখনও বিদ্যুৎ যায়নি। অন্যদিকে জেলার সব সড়কে যানবাহন চলাচল শুরু হয়েছে। 
সূত্র: বিডি লাইভ।

শেয়ার করুন

0 comments:

পাঠকের মতামতের জন্য কানাইঘাট নিউজ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়

নোটিশ :   কানাইঘাট নিউজ ডটকমে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক